image description

রেশমপথের মেঘমুলুকে অন্তিম দৃশ্যপট

"হঠাৎ কখন সন্ধ্যা বেলায়
নামহারা ফুল গন্ধ এলায়
প্রভাতবেলায় হেলাভরে করে 
অরুন কিরণে তুচ্ছ
উদ্ধত যত শাখার শিখরে
রডোডেনড্রন গুচ্ছ"---
মনের ভিতর নিবারণ চক্কোত্তি গুনগুনিয়ে উঠতে বাধ্য এ পথে এলে..! রডোডেনড্রন নিয়ে ফ্যান্টাসি নেই এমন ভ্রমণপ্রিয়,পাহাড়প্রিয় বাঙালি কম ই আছে...
আমিও ব্যতিক্রম নই..রডোডেনড্রন নাম টার মধ্যেই অমোঘ আকর্ষণ লুকিয়ে..এক ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে লালি গুরাস এর মাঝে মধুসংগ্রহকারী সানবার্ড এর ছবি দেখে ফ্যান্টাসি পাগলামির পর্যায়ে চলে যায়,প্রবল ভ্রমণ জ্বরে আক্রান্ত হয়ে যাই...তড়িঘড়ি, বার্সে যাওয়ার জন্য এপ্রিলে NJP র দুটো টিকিট কেটে ফেলি..কপাল মন্দ থাকায় অনিবার্য কারণে সে যাওয়া হয়ে ওঠেনা...তাই দাওয়াই খুঁজতে রেশমপথে ,গুরাস না থাক, পাহাড়ি নিসর্গ তো থাকবেই...


কিন্তু জুলুক ছাড়তেই দেখি বিষন্ন পাহাড়ের বুক চিরে নিভৃতে ,উদ্ধত অহংকারে ফুটে রয়েছে রাশি রাশি গুরাস...লাল,বেগুনি,গোলাপি,,সাদা কিংবা হলুদ..কোথাও তারা ধরাছোঁয়ার মধ্যে,পথের দুপাশে ঝোপ আলো করে ফুটে রয়েছে,কোথাও আবার বহুদূরে পাহাড়ের ঢালে উদ্ধত রঙ্গিনী রডোডেনড্রন...বার্সে যেতে না পারার ক্ষতে প্রলেপ দিচ্ছে লালি গুরাসের বন... ছুটে যাই সেই রক্তিম জঙ্গলে ,ছুঁয়ে দেখতে থাকি স্বপ্নের পারিজাত...


নাথাং ভ্যালির প্রবেশপথে আবার গোলাপি বেগুনীর আধিপত্য..ছাঙ্গুর আশেপাশেও তাই,টুকলা ভ্যালি রঞ্জিত হলুদ গুরাসে ,কখনো বা সাদায়!
বছরের অনেকটা সময় নাথাং বরফে আবৃত থাকে,তবে এখন কচি ঘাসে মোড়া এক pastoral তৃণভূমি,...বুক চিরে গেছে কিছু ছোট ছোট জলধারা,গোটা কয়েক খেলনা বাড়ি,ইতিউতি গুরাসের ঝোপ আর বর্ণনাতীত সৌন্দর্য...সবুজ পাহাড়ের ঢালে ইয়াকের চড়ে বেড়ানো,চতুর্দিকে ঢেউ খেলানো পাহাড়,যেন এক অনবদ্য কবিতা..পা রাখতেই কানে আসতে থাকে এক মধুর ঘন্টাধনি, যেন মন্দিরে আরতি হচ্ছে কাসর ঘন্টা সমেত,কিন্তু না কোনো মন্দির তো চোখে পড়ছে না...আওয়াজের উৎস অনুসরণ করে দেখি,শব্দ ভেসে আসছে ওই বুগিয়াল থেকেই, যেখানে চড়ে বেড়াচ্ছে ইয়াকের দল,সম্ভবত ওদের গলায় বাঁধা ঘন্টা থেকেই এই টুংটাং আওয়াজ,যা পাহাড়ের গায়ে প্রতিধ্বনিত হয়ে ভাসিয়ে দিচ্ছে চরাচর..নাথাং এর প্রেমে পড়তে সময় লাগলোনা.. গোটা রেশমপথে এর মত অপার্থিব স্থান আর দুটি পাইনি.. মাস্টার দিদিমনি দের এমনিতেই কম নাম্বার দেওয়ার বদভ্যাস থাকে,তবে আমার কাছে নাথাং দশে দশ ই পেল,বাকিরা সাত,আট,নয়...


তবে এ অঞ্চল ইন্দো টিবেতান বর্ডার এ অবস্থিত হওয়ায় সেনা দের বেশ আধিপত্য আছে,আছে কড়া নজরদারি.. যাওয়ার পথে চোখে পড়লো আর্মি ক্যাম্প,আর্মি বাঙ্কার...বাড়িঘর আপনজন ছেড়ে থাকা কমবয়সী করুন মুখের জওয়ানদের..! bounty of nature আর pity of war এর আশ্চর্য সহাবস্থান!


তারপর দেখলাম অনেক কিছুই,13000 হাজার ফিট উচ্চতায় অবস্থিত কুপুপ বা বিতান সো লেক,যার থেকে উৎপত্তি জলঢাকা নদীর,হলদেটে টুকলা ভ্যালি তে বাবা হরভজন সিং এর পুরানো মন্দির টা, ছাঙ্গু লেক,কিন্তু মন পরে রইলো নাথাং এ,100% মার্কস পেয়ে সে তখন প্রথম স্থান অধিকার করে রয়েছে,বাকিরা ধারেকাছে নেই..শুধু ঘাড়ের কাছে নিঃশ্বাস ফেলছে দ্বিতীয় হওয়া মেমেন্চো লেক...অপূর্ব সুন্দর..দূর থেকে দেখেছি,ইচ্ছা আছে পরের বার কাছে গিয়ে থাকবো,আর নাথাং এর সাথে ইন্টারভিউ টাও আরো ভালো ভাবে করা যাবে!!


এদিকে ছায়া ঘনিয়ে আসতে থাকে বিস্তীর্ণ বৃক্ষহীন প্রান্তরে,কনকনে ঠান্ডা হাওয়ার তীব্রতা বাড়তে থাকে ,ঘরে ফেরার সময় এলো...ভালোলাগা আর অভিজ্ঞতার ঝুলি ভর্তি করে ফিরতে থাকি,পিছনে পরে থাকে রেশমপথ..দাবার গাড়ি তে তখন বেজে চলেছে __
"জিন্দেগি কে সফর মে গুজার যাতে হ্যায় যো মকাম/ও ফির নাহি আতে, ও ফির নাহি আতে"

না আসুক, ছকেবাঁধা জীবনে স্বপ্ন হয়ে,সুখস্মৃতি হয়ে সে আসবে,সে আসবেই আমি জানি....