image description

রঙ যেন মোর মর্মে লাগে

"রঙ যেন মোর মর্মে লাগে, 

আমার সকল কর্মে লাগে,

 সন্ধ্যাদীপের আগায় লাগে, 

গভীর রাতের জাগায় লাগে।।"


পশ্চিম মেদিনীপুরের পিংলার অন্তর্গত নয়া গ্রামের বাসিন্দারা বোধহয় এই মন্ত্রই জপ করেন..যেখানে প্রতিটি গ্রামবাসীই রং দিয়ে ম্যাজিক বুনতে জানে... যাদের প্রাত্যহিক জীবনই আবর্তিত হয় রং তুলি,ছবি গানের মধ্যে...তবে বছরের এই সময় টা তে,বাতাসে যখন হৈমন্তী সুর,ওরা মেতে ওঠে ওদের নিজস্ব কার্নিভালে...ওরা মেতে ওঠে পটের মেলা পটমায়ায় ! এখানে তখন মাটির নিকানো দেয়াল রঙিন ক্যানভাস হয়ে ওঠে ছবিতে,রঙেতে! সমবেত কিংবা পটশিল্পীর একক পটগানে,ছৌ কিংবা ঝুমুর গানে মুখরিত হয়ে ওঠে ওদের বসতি ; বিকিকিনি,গান ও গল্পে জীবনের গল্প হোক যত অল্প খানিক বদলায়...!


সেই রঙের ছোঁয়ায় নিজেকে রাঙাতে, ব্যস্ত জীবন থেকে একটু সময় চুরি করে পৌঁছে গেলাম হাওড়া স্টেশন সক্কাল সক্কাল... গন্তব্য বালিচক! লোকাল ট্রেনের জানালা দিয়ে দেখি একে একে পেরিয়ে যায় উলুবেড়িয়া, কোলাঘাট,মেছেদা.... দুপাশে হলদে ছোপের ধানক্ষেত। এদিকে পেটে ছুঁচোরা কেত্তন শুরু করে দিয়েছে..আর মেদিনীপুর লোকালে উঠে মুড়ি আর চপ না খেলে সমাজ মেনে নেবে না????????..অতঃপর তাই দিয়েই প্রাতরাশ!


বালিয়াচক নেমে 'নয়া' আরো 12-15 কিমি... টোটো তে চড়ে হালকা শীতের আমেজ মেখে এগিয়ে চলা..মুন্ডুমারী মোড় পেরোতেই শ্যামল করুন রূপকথা..দুপাশে সোনার ফসলের আহ্বান, মাঝে পিচকালো রাস্তা, মাথায় সোনাঝুরির চাঁদোয়া! ধানের ক্ষেতে, সোনাঝুরির ফুলে সোনা রঙ লেগেছে...আর সেই 'হেমন্তের অরণ্যে একাকী পোস্টম্যান' হয়ে তারে ঝুলছে মিষ্টি একটা দুটো বাঁশপাতি..
অতঃপর রঙের রাজ্যে প্রবেশ..শিল্পী আর শিল্প একসাথে..কাকে ছাড়ি,আর কাকে দেখি...দাওয়ায় বসে আপনমনে খেলা শিশু, তুলি দিয়ে কাহিনী আঁকা বৃদ্ধ, বিকিকিনি তে ব্যস্ত মহিলা দের কে, নাকি অসংখ্য পটচিত্র,ঘর সাজানোর টুকিটাকি, রকমারি ওড়না, হরেক কিসিমের পসরা, নাকি বিশাল বিশাল ক্যামেরা কাঁধে শহরের বাবু বিবি দের(বিশাল না হোক, মোটামুটি কাজ চালানো যায় এমন একটা ক্যামেরা নিয়ে আমিও তাদেরই দলে)।


এই ফাঁকে কিছু তথ্য দিয়ে দিই, যা মূলত গুগল আর শিল্পীদের বক্তব্য থেকে আহৃৎ (যদিও তথ্যের কচকচানি আমার মোটে ভালো লাগেনা, তাছাড়া হাতের মুঠোয় ইন্টারনেট এসে যাওয়ায় লোকে অতিরিক্ত জ্ঞানও মোটে শুনতে চায়না!!তবুও...)
পিংলার নয়া বাংলার হারিয়ে যেতে বসা পটচিত্রের শিল্পীদের গ্রাম। হাজার বছরের প্রাচীন এই শিল্পকে আঁকড়ে আজও বেঁচে আছেন মেদিনীপুরের পিংলা ব্লকের প্রত্যন্ত এই গ্রামের বাসিন্দারা। আগে গান, পরে হয় পট। মূলত দু’ধরনের পট তৈরি হয় - জড়ানো পট আর চৌকো পট। জড়ানো পটে কোন কাব্য, ঘটনা এই সব চিত্রিত হয়। আর নানান গল্পকথা শিল্পী ফুটিয়ে তোলেন চৌকো পটে। পরবর্তী কালে অবশ্য কালীঘাটের পট প্রচলিত হয় উনিশ শতক নাগাদ।


বাংলার লোকসংস্কৃতির বহু পুরনো রীতি পটচিত্র অঙ্কন। এই পটচিত্রে নানা ধরনের গল্প লম্বা লম্বা গোটানো কাগজের ক্যানভাসের উপর নানা বর্ণে আঁকা থাকে। এই চিত্রশিল্পীরা বা পটুয়ারা গ্রামেগঞ্জে ঘুরে ঘুরে এই চিত্রগুলির উপর রচিত গল্পগাথাগুলি সুর করে গায় এবং ওই গোটানো কাগজের ক্যানভাস একটু একটু খুলে তার উপর আঁকা চিত্রগুলি দর্শকদের দেখায়। পট্ট কথাটি এসেছে সংস্কৃত থেকে, যার অর্থ কাপড়ের টুকরো এবং চিত্র মানে অঙ্কন। এই পটচিত্র শিল্পীদের ব্যবহৃত উজ্জ্বল রঙ, রেখা ও তুলির টানের জন্য বিখ্যাত। গোটানো ক্যানভাস খুলে পটের ছবি দেখাতে দেখাতে শিল্পীরা যে গান করেন তাকে বলে পটের গান। এই সব গানের কথা তাঁরা নিজেরাই বানান এবং সুর নিজেরাই দেন। এই গান পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে প্রবাহিত হয়।আগে পটুয়া বলতে সাধারণত বোঝাত এমন এক সম্প্রদায়, যাঁদের জীবিকা ছিল ভিক্ষাবৃত্তি। তাঁরা ধর্মীয় ভাবাবেগকে সামনে রেখে পট আঁকতেন। যেমন, রাম-রাবণের যুদ্ধ বা সীতার বনবাস। বিষয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তৈরি হত সেই গান। লম্বা সেই পট খুলতে খুলতে গান গেয়ে গ্রামে গ্রামে ঘুরে বেড়াতেন পটুয়ারা। তা দেখে চাল, আলু বা পয়সা দিতেন গ্রামের মানুষ। পরবর্তীকালে সরকার বা বিভিন্ন সংস্থার সাহায্যে পটচিত্র বিদেশেও খ্যাতি লাভ করে। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পটচিত্র আধুনিক রূপ পেতে থাকে। এখন শাড়ি-ব্লাউজে, পাঞ্জাবি-জুতো, এমনকী ডাইনিং টেবিল, গ্লাসেও পটচিত্র শোভা পায়।


কেনাকাটা, ছবি তোলার ফাঁকে খানিক আড্ডা ও দেওয়া হলো স্থানীয় শিল্পী দের সাথে;তেমনি একজন হলো শ্যামসুন্দর চিত্রকর, ষাটোর্ধ মিশুকে এক মানুষ..বাড়ির দাওয়ায় বসে পটের ইতিহাস, প্রাকৃতিক রঙের ব্যবহার, প্রভৃতি শোনাতে লাগলেন, ওনার মেয়ে সম্প্রতি বাংলার শিল্প বিশ্ব দরবারে (নরওয়ে) নিয়ে গিয়েছিলেন,সে গল্প ও শোনালেন। সঙ্গে উপরি পাওনা ওনার পটগান,মনসামঙ্গল থেকে এইডস, চৈতন্যদেব থেকে বৃক্ষ রোপণ সর্বত্র অনায়াস বিচরণ গানে গানে। পরের বার এলে ওনার বাড়িতে থাকার আমন্ত্রণ ও পেলাম।


কলকাতার হরেক রকমের বৈভবে চোখ সওয়া মানুষের চোখে হয়তো খুবই সাদামাটা লাগবে পটুয়াদের এই নিজস্ব কার্নিভাল, তবে এটা কেবল তাদের উৎসব উৎযাপন নয় নয়,এটা তাদের জীবন এর উদযাপন! সবথেকে ভালো লাগলো এটা দেখে যে,গ্রামের অধিকংশ বাসিন্দা মুসলিম, কিন্তু রামায়ণ ,মহাভারত,দুর্গালীলার কাহিনী তাদেরই তুলিতে,তাদের কথায় ও সুরে কি সুন্দর প্রাণ পাচ্ছে! শিল্পীর প্রাণে রাম ও রহিম,আল্লাহ ও ঈশ্বর বিরোধ বাঁধায়না! পদবি তে 'খান' না 'ব্যানার্জি' দেখে জাত চিনবে,তাও হবেনা এখানে! এনাদের একটাই পদবি চিত্রকর! সত্যিই শিল্পীর জাত হয়না,ধর্ম হয়না! 
হায়!ধর্ম ও জাতের রক্তচক্ষু পাহারাদারেরা যদি তাদের পতিত মানবজমিনে এমন সোনা আবাদ করতে পারতো,পৃথিবী টা হয়তো একটু অন্য রকম হত !!