image description

বার্সে যখন লাল

"রাজার ঘরে যে ধন আছে,
টুনির ঘরেও সে ধন আছে।
বিদেশেতে যে ধন আছে
আমার দেশেও সে ধন আছে॥"
আমাদের ভারতবর্ষ ভৌগোলিক ভাবে সমৃদ্ধ এবং প্রাকৃতিক বৈচিত্রসম্পন্ন এক দেশ। বিদেশে ভ্রমণের তেমন বিশেষ ইচ্ছে নেই, তাই দু একবার এর বেশি যাওয়া হয়ে ওঠেনি। মাসে দু একবার যা ঘুরতে বের হই তা স্বপ্রকৃতির টানেই বটে। ভারতের উত্তর-পূর্বে
অবস্থিত রাজ্য গুলির মধ্যে সিকিম অন্যতম ও আমার অত্যন্ত প্রিয়। 
তাই এ দিন আমাদের গন্তব্য ছিল পশ্চিম সিকিমের বার্সে বা ভার্সে। এই জায়গাটার আসার পরিকল্পনা করার সময় থেকেই শরীরে একটা অদ্ভূত শিহরণ হয়েছিল। আমার অনেক দিনের প্রত্যাশা ছিল এই বার্সেতে আসার। নিউ জলপাইগুড়ি থেকে গাড়ি করে রওনা হলাম বার্সের পথে। বার্সের পথে যেতে যেতে দেখা মিলল তিস্তার। তিস্তা যেন হাতছানি দিয়ে তার রুপ দর্শনে আমাদের আহ্বান জানাচ্ছে।



"নদী সেথায় স্রোতোস্বিনী, গাছ-পাহাড়ের কোলে,
তারই পাশে অমসৃণ রাস্তা গেছে চলে।
নদীর ঢেউয়ে ভাঙ্গাগড়া, শব্দ কুলু কুলু,
শান্তিকামী মন - মানুষের জীয়ন কাঠির মুলুক।"

নদী পেরিয়ে পাহাড়, পাহাড় পেরিয়ে নদী। পাহাড়ী পথের চিরসাথী ঝর্ণা, পথে পেলাম অসংখ্য নির্মল ঝর্ণা। অবিরাম ঝড়ে পড়া ঝর্ণা এই পথের যাত্রা কে এক আলাদা অনুভূতি দিয়েছিল। আমাদের দেহ-মন সবই চোখে নৈসর্গিক দৃশ্য দেখার অদম্য বাসনা প্রকাশ করেছিল বারবার। সৌন্দর্যই যখন মুখ্য বিষয় তখন আর কি চাই..? রিমঝিম শব্দ আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যই হলো ঝর্ণার প্রধান অলঙ্কার। ঝর্ণাগুলোর উচ্চতা খুব একটা নয়, তবে নৈসর্গ অপার। ঝর্ণার চারপাশে পাথরের ভাজে ভাজে প্রাকৃতিকভাবে খাঁজকাটা বেঞ্চের মতো, এ যেন ভ্রমণ পিপাসুদের কাছে টানার জন্য প্রকৃতির নিঃস্বার্থ প্রেমের উজ্জ্বল আবেদন। সবাই পথে কিছুটা ক্লান্ত হওয়ার ফলে ঝর্ণার ধারে নেমে কিছুক্ষণ জিরিয়ে নিয়ে আবারও চললাম। এই সমস্ত অবগহনের পরও তৃপ্তি মেটেনি দে-ছুট ভ্রমণ পিপাসুদের। অমসৃণ রাস্তা বেয়ে উঠতে লাগলাম বার্সের পথে। কোথাও কোথাও এতটা ঘন জঙ্গল আর খাড়া পথ যে, পড়লেই শেষ নিশ্বাস। তবে এসব কিছুই তুচ্ছ মনে হলো রিয়েল এ্যাডভেঞ্চার প্রিয়দের কাছে। বার্সে রডোডেনড্রন স্যাঙ্কচুয়ারিতে এমনই এক জায়গা, যেখান থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা, পান্ডিম, কাবরু-সহ বহু দূর পর্যন্ত বিস্তৃত তুষারশৃঙ্গরাজির এক অনবদ্য দৃশ্য দেখা যায়, যদিও আবহাওয়া মেঘলা থাকায় সেই সৌভাগ্য আমাদের হয়নি। তবে সৌভাগ্য না হওয়ায় কি বা যায় আসে..! পাহাড়ি সৌন্দর্য আর আলো আধারের লুকোচুরিই মন জয় করে নিয়েছিল। মনে হচ্ছিল আর কিচ্ছু চাই না।জায়গাটির উচ্চতা প্রায় ১০,০০০ ফুট আর তাই সবথেকে বেশি ঠান্ডা উপভোগ করলাম এই জায়গায়। চারপাশ ঘন জঙ্গলে ঢাকা পাহাড়ি ঘেরাটোপ। নিস্তব্ধ পরিবেশে নানান রঙের পাখি দেখতে পেলাম দু’চোখ ভরে। রেড পান্ডা, ব্ল্যাক বিয়ার, বন্য শুয়োর, হরিণ ও চিতাবাঘের চারণভূমি হল এই স্যাঙ্কচুয়ারি অঞ্চল। যদিও আমাদের ড্রাইভার দাদা সেগুলোর ছবি দেখিয়েই আমাদের সান্ত্বনা দিলেন। হিলে অবধি গাড়ি চলা রাস্তা। সেখান থেকে একেবারেই সহজ ৪.৫ কিলোমিটারের ট্রেকিং পথ, যেতে সময় লাগবে দেড় থেকে দু’ঘণ্টা। ঘন জঙ্গলের মধ্য দিয়েই পায়ে চলা এই পথ চলে গেছে উপরের দিকে। আমরাও চললাম কিছু দূর। বাঁশের জঙ্গল আর রডোডেনড্রন গুচ্ছ ফিয়ে সাজানো পথ যেন স্বর্গের পথ। বার্সের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখেই যেন আমরা সবাই আত্মহারা। সেই পথ ধরে অনেকটা হাঁটলাম। মার্চ (মাঝামাঝি) থেকে এপ্রিলে এই পথ ভরে থাকে রডোডেনড্রনের রঙে। ১৭ প্রজাতির রডোডেনড্রন ফোটে এই অঞ্চলে। এছাড়াও নানান ফুলের সম্ভারে বার্সে এক আলাদা স্বর্গীয় মাত্রা পায়।


এ ছাড়াও দুষ্প্রাপ্য ঔষধি, ম্যাগনোলিয়া, অর্কিড ও অন্যান্য নানারকমের ফুল দেখতে পেলাম। ফেরার পথে মামুর সাথে 'হিমুচান' এর গল্প এক আলাদা মাত্রা দিল এই সফরটাকে। পথের সমস্ত ক্লান্তি যেন উধাও হয়ে গেল হাসি ঠাট্টায়। গাড়ির ভিতর সে যেন এক যাত্রাপালা চললো ঘন্টা খানিক। যদিও আমিই ছিলাম তার প্রধান কর্ণধার। সকলে মিলে খুব আনন্দ করতে করতে ফেরার পথে একটাই কথা মন অবচেতনে বলে উঠছিল বারবার - ব্যস্ত, নাগরিক সভ্যতার যান্ত্রিক জীবনযাপন থেকে শতযোজন দূরে বেঁচে থাক এই একফালি পাহাড়, এই সুন্দরী বার্সে। একরাশ ভাল লাগা সঙ্গে নিয়ে বিদায় জানালাম বার্সে কে।