image description

Weekend Trip To Mousuni Island- A Virgin Island

খারাপ ভালো দুইরকমের অভিজ্ঞতাই হলো, সেগুলোই ভাগ করে নিলাম সবার সাথে। বেশীরভাগটাই ভালো অভিজ্ঞতা, তাই সেই গল্পই আগে শোনানো যাক।

মৌসুনী দ্বীপের কথা প্রথম শোনার পর থেকেই আমার যে কারনে ওইখানে যাওয়ার ইচ্ছা হয়, তার অন্যতম দুটো কারন হল ১) নির্জন সমুদ্র সৈকতকে তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করা এবং ২) সমুদ্র সৈকতের লাগোয়া তাবুতে(Tent) থাকার অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করা, কারন আমি এর আগে কোনদিন তাবুতে থাকি নি। যাই হোক, এরপর হন্যে হয়ে ভ্রমণসঙ্গী খুঁজতে লাগলাম নাম না জানা এই সমুদ্র সৈকতে যাওয়ার জন্য। স্কুল কলেজ পাড়া এবং হালফিলের কাছের সব বন্ধুদেরই মোটামুটি বলেছিলাম কিন্তু লোকজন চেনা-পরিচিত জায়গাতে যতটা আগ্রহ দেখায়, নাম না জানা জায়গাগুলোতে যেতে ততোটা স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে না। আমার আবার নাম না জানা জায়গা ঘুরতেই বেশী ভালো লাগে। অবশেষে সব বন্ধুমহল থেকে প্রত্যাখ্যাত হয়ে মনমরা হয়ে একটা ছোট্ট ওয়াটসআপ গ্রুপে ঘুরতে যাওয়ার কথাটা পাড়লাম। এই গ্রুপে প্রথমে বলি নি, তার কারন এই গ্রুপের সবাই বিলাসবহুলভাবে থাকাখাওয়া করতে ভালোবাসে, আর আমি যেখানে ঘুরতে যেতে চাইছি সেখানে বিলাসিতা দূরের কথা, থাকতে হবে তাবুতে এবং ভাগ করে নিতে হবে কমন টয়লেট। ঘুরতে যাওয়ার নাম শুনেই যে প্রথমেই রাজি হল যে গ্রুপের সবথেকে কনিষ্ঠ মেম্বার সৈকত। তারপর রাজী হল অর্জুন দা, আগামী বুধবার রাশিয়াতে ওয়ার্ল্ড কাপ ফুটবল ম্যাচ দেখতে যাবে, তা সত্ত্বেও একদিনের জন্য উইকএন্ড ট্যুরে যেতে রাজি। এরপর শুভজিৎ দাও রাজি হল, যে শুভজিৎ দা বাড়ী থেকে বাজার যেতে হলেও গাড়ী ছাড়া নড়তে পারে না সেও কোন এক অজানা কারনে একবার বলতেই রাজি হয়ে গেল। এরপর একদিন কল কনফারেন্সে সবাই মিলে সিদ্ধার্থ দাকে নিলাম, এই দাদার আবার এসির হাওয়া গায়ে না লাগলে ঘুম আসে না, তাই প্রথম থেকে এই মোসুনী দ্বীপ যাওয়ার ব্যাপারে বিরোধীতা করে আসছিল কারন যেখানে আমাদের যাওয়ার কথা সেখানে এসিতো দূর কি বাত, ইলেক্ট্রিসিটিই পোঁছায় নি এখনো। ????????তবুও কল কনফারেন্সর সকলের প্রচেষ্টাতে ওনাকে রাজি করানো হল। এইবার সৌমাল্য দা, এই দাদাকে ঘুরতে যাওয়ার কথা কিছু বলাই হয় নি কারন নিজে ড্রাইভ করে গাড়ী চালিয়ে ঘুরতে যাওয়া ছাড়া এই দাদা কোথাও ঘুরতে যান না। আর আমরা যেখানে যাওয়ার কথা ভাবছি সেখানে গাড়ী করে যাওয়া সম্ভব নয় তাই ভেবেছিলাম এই দাদাকে কোনভাবে রাজী করানো যাবে না কিন্তু অদ্ভুত ভাবে এই দাদাও রাজী হয়ে গেল। অতঃপর এই ছয়জনের দল তৈরি হল আমাদের এবং ওইদিনিই Izifiso Backpackers' Camp-er ওয়েবসাইট (www.mousuni.com) থেকে ৬নের থাকার তাবু এবং খাওয়া দাওয়া সমেত ১২০০টাকা প্রতিজন প্রতিরাত্রি হিসেবে বুক করে দিলাম আর দিন গুণতে থাকলাম আমাদের রওয়ানা হওয়ার দিনের যেটা ছিল শুক্রবার (১৫/০৬/২০১৮)।




এইবার এলো ঘুরতে যাওয়ার দিন। সকাল ৭.১৪মিনিটের ট্রেন শিয়ালদহ দক্ষিণ শাখা থেকে ধরতে হবে। সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠতে হবে, তাই আগেরদিন রাতে ঘুম হল না সেভাবে। ওয়াটসআপে এইটা ব্যাগে নিবি ওইটা ব্যাগে নিবি করে আড্ডা মারতে মারতেই সকাল হয়ে গেল। এরপর কাঁধে ব্যাগ নিয়ে বেড়িয়ে পড়লাম অজানা সেই দ্বীপে যাওয়ার উদ্দেশ্য নিয়ে। শিয়ালদহ স্টেশনে বেশকিছুটা আগেই পৌঁছে গেলাম সবাই। তারপর শিয়ালদহ থেকে নামখানা যাওয়ার টিকিট(Rs25) কাটলাম। আনন্দ করতে করতে ট্রেনে উঠে একসাথে সবার জায়গা দখল করে যাচ্ছিলাম ভালোই। হকার ভাইদের থেকে জল লিচু পেয়ারা ঝালমুড়ি ছোলাসেদ্ধ সহযোগে দেদার মুখ চলছিল। তখনও অবধি গরম খুব একটা অনুভব করি নি কেউই। এইবার ট্রেন লক্ষীকান্তপুর দাঁড়াতে স্টেশন থেকেই পুরি সব্জী সহযোগে প্রাতরাশ করে চললাম নামখানার দিকে। নামখানাতে ট্রেন সঠিক সময়েই পোঁছে দিল, সময় নিল ৩ঘন্টা। তারপর সেখান থেকে টোটো(Rs10/ per head) ধরে গেলাম খেয়াঘাট, সময় নিল মিনিট দশেক। খেয়াঘাট পৌঁছে নৌকাতে(Rs2/ per head) উঠে পাড় হলাম হাতানিয়া-দোতানিয়া নদী, সময় নিল ২-৩মিনিট। এরপর একটা ভ্যানে(Rs5/ per head) উঠে পৌঁছালাম বাসস্ট্যান্ড, সময় নিল ৩-৪মিনিট। বাসস্ট্যান্ড পৌঁছে একটা ম্যাজিক গাড়ী ভাড়া করলাম এবং পৌঁছালাম বাগডাঙ্গা ঘাট। পুরো গাড়ী ভাড়া করতে নিল ৩৫০টাকা এবং বাগডাঙ্গা ঘাট পৌঁছাতে সময় নিল ৪৫মিনিট মতো। ঘাটে পোঁছে চেনাই নদী পার হতে সময় নিল ২-৩মিনিট যার নৌকা ভাড়া ২টাকা প্রতি জন। এরপর ঘাট থেকে একটা টোটো নিয়ে পৌঁছালাম 'সল্ট' নামের এক জায়গাতে। সময় লাগলো ৩০মিনিট মতো এবং টোটো ভাড়া ২০টাকা প্রতিজন। সল্টে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল Izifiso-এর জয়দেব। ছোট্ট ভাইটা আমাদের গ্রাম্য পথ দেখিয়ে ২-৩মিনিট হাঁটিয়ে নিয়ে গেল আমাদের তাবুর সামনে। চড়া রোদে এতগুলো যানবাহন পালটে দুপুর ১২.৩০মিনিটে এতদূর আসার পর স্বাভাবিক ভাবেই সবাই ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম। ক্লান্তির হাত থেকে রক্ষা করতে দুটো ছোট্টখাট্টো ছেলে আমাদের জন্য নিয়ে এলো কচি ডাব। সেটা খেয়েই পিঠের ব্যাগগুলো তাবুর মধ্যে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে বসে পড়লাম খড়ের ছাঁয়নী বেষ্টিত বাঁশের তৈরি পাটাতনের উপর। একদম চোখের সামনে সমুদ্র সৈকত এবং সেইসাথে তুমুল হাওয়া চোখ এবং মন জুড়িয়ে দিচ্ছিল। প্রকৃতির এই মায়াবী রূপ চাক্ষুষ করে ক্লান্তি হার মেনেছিল সৌন্দর্যের কাছে। ????

আমার আর তর সইছিল না। জামাকাপড় ছেড়েই ঝুপ করে ঝাঁপ মাড়ালাম সমুদ্রতে। পুরো সমুদ্র সৈকতে আমি তখন একা রাজা, চারিপাশে কেউ নেই। এরপর একে একে সবাই যোগ দিল। ঘন্টাখানেক সমুদ্র স্নান করে আমাদের তাবুর পাশেই একটা পুকুরে ঝাঁপ মারলাম এবং সেখানেও স্নান করলাম প্রায় আধঘণ্টা মতো। জলের সাথে এতো কুস্তি করার পরে পেটেও টান মারা শুরু হয়ে গিয়েছিল। ভীজে জামাকাপড় ছেড়ে সেগুলো রৌদ্রে মেলে দেওয়ার পরে বসলাম সবাই একসাথে দুপুরের খাওয়ার খেতে। সুস্বাদু ভাত ডাল আলুভাজা ঢ্যাঁড়সের তরকারী রুইমাছের তরকারী দিয়ে মধ্যাহ্নভোজন করে একটু ঘুম ঘুম পাচ্ছিল, তাই তাবুর ভীতরে গিয়ে শুয়ে পড়লাম। কিন্তু মাটির কটেজ তৈরী করা হচ্ছে বলে তাবুগুলোর মুখ সম্প্রতি পরিবর্তন করা হয়েছে আর সেটা এমনভাবে হয়েছে যে হাওয়াই ঢুকছিল না তাবুর ভিতর। সামনে পিছনে তাবুর সবকটা পর্দা খুলে দিয়েও হাওয়া পেলাম না একটুও। দরদর করে ঘামছি তখন, সে কি গরম কি গরম বলে বোঝানো যাবে না। নাঃ, প্রথম তাবুতে শোয়ার অভিজ্ঞতা খুব একটা ভালো হলো না আমাদের। এরপর কখনো দড়ির দোলনাতে, কখনো কাঠের পাটাতনের উপর শোয়ার চেষ্টা করলাম কিন্তু সবই বিফলে গেল। ক্যাম্প সংগঠকরা কয়েকটা যদি চেয়ারের ব্যবস্থা করতেন যেটাতে পিঠটা হেলান দিয়ে বসা যায় অন্তত, তাহলে বেশ কিছুটা আরাম পাওয়া যেত। এতটা জার্নি করে গিয়ে ঠিকমতো বসা শোয়ার জায়গার অভাব অনুভব করছিলাম বেশ ভালোই। এরপর সূর্য ডোবার পালা। সূর্যাস্ত তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করলাম। এইসময় গরম বেশ কমে গিয়েছিল আর সাথে ঠান্ডা সমুদ্রের হাওয়াতো ছিলই। বেশ কিছুটা হাঁটলাম বিচের উপর দিয়ে আশেপাশের সৌন্দর্য দেখার জন্য। হেঁটে যখন ক্যাম্পের দিকে ফিরছি, তখন অন্ধকার নেমে এসেছে। ভালো লাগছিল জায়গাটা এখন বেশ। চারদিক ঘুটঘুটে অন্ধকার, হ্যারিকেনের আলো জ্বলছে টিমটিম করে, গ্রামের সারল্যতা ফুটে উঠছিল সেই সময় ওইখানকার কিছু বাচ্ছা এবং বয়েস্ক কয়েকজনের সাথে আড্ডা দিয়ে। এরপর মুড়ি পেঁয়াজি চা দিয়ে গেল ক্যাম্পেরই একজন। দুপুরেই কাঁকড়া ফ্রাই এবং মাছভাজা আলাদা করে অর্ডার করেছিলাম সন্ধ্যেবেলার জন্য, যেটা ঐ ১২০০টাকার প্যাকেজের বাইরে ছিল। সব এক এক করে সদ্গতি করে কিছুক্ষণ আড্ডা দেওয়ার পরে রাতের খাওয়ার খেতে বসলাম রুটি আলুভাজা আর দিসি মুরগীর ঝোল দিয়ে।




এরপর সবাই কিছুটা আড্ডা দিয়ে ঘুমোতে যাওয়ার পালা। দুপুরে তাবুর ভিতরে ঘুমোতে পারি নি কিন্তু ভেবেছিলাম রাতে টেম্পারেচার কম থাকবে তাই হয়তো অসুবিধে হবে না কিন্তু সে ভাবনা ভুল ছিল। ৫মিনিটের বেশী কেউ আমরা তাবুর ভিতরে শুতে পারলাম না কারন তাবুর বাইরে তবুও সমুদ্রের হাওয়া আসছিল কিন্তু ভীতরে হাওয়াই ছিল না কোনরকম। আগেরদিন রাতে ভালো করে ঘুম হয় নি সকালে ট্রেন ধরবো বলে, এরপর সারাদিন প্রখর রোদে এতোখানি পথ অতিক্রম করে সারাদিন লম্ফঝম্প করে যদি রাতে ঠিক করে ঘুমানোর জায়গা না পাওয়া যায়, তার থেকে করুণ অবস্থা মনে হয় হতে পারে না। ঠিক করলাম তাবুর ভিতরের গদিগুলো তুলে নিয়ে তাবুর বাইরে বিছানা করে শুয়ে পড়বো কিন্তু পোঁকামাকড় সাপখোপের ভয় লাগছিল, যদিও গ্রামের লোকেরা আমাদের আশ্বাস দিয়েছিল সাপখোক নেই সেখানে কিন্তু আশেপাশে চারিদিক জঙ্গল হওয়াতে ভয় লাগছিল। পোকামাকড়ের ভয় উপেক্ষা করে শুলাম মাটিতে বিছানা করে কিন্তু সমুদ্রর হাওয়াতে এত বালি উড়ে এসে চোখেমুখে পড়ছিল এবং মশা কামড়াছিল যে ঘুম আসছিল না। তারপর ক্যাম্পেরই একজন বিছানার চারিধারে জল ঢেলে দিয়ে কিছুক্ষনের জন্য বালি উড়ার হাত থেকে মুক্তি দিয়েছিল বটে কিন্তু তা সত্ত্বেও ঘুম এলো না। আর শনিবার ঈদ হওয়ার জন্য ক্যাম্পের পাশে কোথাও একটা সারারাত জোড়ে মাইক চলছিল এবং গায়ের উপর মাঝেমধ্যে কাঁকড়া জাতীয় কিছু উঠে পড়ছিল। ভয়ে তখন আডভেঞ্চার শিঁকেয় উঠেছে তখন। যাই হোক একটা রাত না ঘুমিয়েই কাটিয়ে দিলাম সবাইমিলে। সকাল হতেই অপেক্ষা করছিলাম সমুদ্রে জোয়ার আসার। চা এবং জলখাবারে লুচি ঘুগনী আর সিমুই খেয়ে সমুদ্রস্নান করে কলকাতার উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। আবার যে ৭-৮টা যানবাহন চেঞ্জ করে ঐ রোদের মধ্যে বাড়ী ফিরতে হবে দুই রাত না ঘুমানো জান্ত লাশগুলোকে নিয়ে। শিয়ালদহে যখন বিকেল ৪.৩০মিনিট নামলাম তখন মারাত্মক গরম। একটা উবের বুক করে উবের ড্রাইভারকে এসির হাওয়াটা জোড়ে করতে বলে বাড়ীর পথে যখন আসছি তখন যে কি আরাম আগছিল কি বলবো। আর তারসাথে ভীষণভাবে মনে পড়ছিল মৌসুনী দ্বীপের ওই গ্রামটার কথা, যেখানে গ্রামের লোকগুলো কোত কষ্টের মধ্যে থেকেও কোত হাসিখুশিতে রয়েছে। সমুদ্রের জল তাদের চাষের জমিতে ঢুকে গিয়ে চাষবাস নষ্ট করে দিয়েছে। মৌসুনী দ্বীপের এই গ্রামগুলো আস্তে আস্তে সমুদ্রর গ্রাসে চলে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। এইভাবে একদিন হয়তো এই দ্বীপের কোনপ্রকার অস্তিত্বই থাকবে না। বেশ মন খারাপ করছিল গ্রামগুলোর জন্য। তবে এই গ্রামে বিদ্যুৎ চলে এসেছে ইতিমধ্যে। খুব তাড়াতাড়ি ক্যাম্পেও আলো চলে আসবে, তারপর আশা করি তাবুগুলোতে পাখার ব্যবস্থা করা হবে, তাহলে আর সেভাবে কষ্ট হবে না হয়তো।




নগরকেন্দ্রিক জীবনে আমরা এতটাই আরামপ্রিয় হয়ে উঠেছি যে, সামান্য কষ্টলভ্য একদিনের জীবনও আমাদের কাছে বিভীষিকা হয়ে উঠেছে। গতকাল বিকেলে বাড়ী পৌঁছেই এসিটা অন করে বাথরুমে ঢুকে ফ্রেশ হয়ে বিছানায় শুয়ে মড়ার মতো ঘুমিয়েছি। আজ রবিবার, সকালে ঘুম থেকে উঠে ল্যাধ খেতে খেতে প্রাতরাশ মধ্যাহ্নভোজন করে এই লেখা যখন লিখছি তখন জানলা দিয়ে উকি মেরে দেখছি যে আকাশের মুখ ভাড় এবং হাল্কা হাল্কা বৃষ্টিও হচ্ছে। এই দেখে এখন ভীষণ ভীষণ আফশোষ হচ্ছে, যদি এইরকম আবহাওয়া গত দুদিন থাকতো তাহলে কিন্তু দারুণ হতো।