image description

সমুদ্র পাহাড় জঙ্গলের মেলবন্ধন

সময় টা জানুয়ারী ৩ তারিখ আমরা ১০ জন বন্ধু মিলে রাতের ট্রেনে বেরিয়ে পড়লাম কুলিডিহা ফরেস্ট এর উদ্দেশে,১০ বন্ধু এক জায়গায় হয়েছি অনেকদিন পর,শহরের কোলাহল ছেড়ে আগত তিন দিন আমরা মুক্ত , রাত ১১ টায় হাওড়া থেকে ট্রেন ছাড়ল, আর শুরু হয়ে গেল বাধন ছাড়া দেদার আড্ডা,রাত যত গভীর হচেছ আমাদের আড্ডা তত জমছে,এভাবে প্রায় সারারাত কাটিয়ে দিলাম ,ভোর ৫ টায় বালাসোর ষ্টেশনে ত্র নামলাম ওখান গাড়ী তে চাঁদিপুর , চাঁদিপুর এ আগে হোটেল বুক করা ছিল ওখানে স্নান সেরে ব্রেকফাস্ট করে বেরিয়ে পড়লাম ,....

গন্তব্য কুলিডিহা,মনে মনে খুব আনন্দ জঙ্গল এ যাব,চাঁদিপুর থেকে কুলডিহা প্রায় ৩ ঘন্টা তাই,এদিকে জঙ্গলে যেতে গেলে চাই সরকারি অনুমতি তাই ড্রাইভার আমাদের বন বিভাগ এর অফিসে অনুমুতি নিয়ে তারপর কুলডিহা নিয়ে যাবে,গাড়ী তে উঠেই একটু ঘুমিয়ে নিলাম সারারাত ঘুম হয়নি ,গাড়ী এসে থামল ওড়িশা বন বিভাগের অফিসে ,ড্রাইভার গেল অনুমতি নিতে আর তার ফাঁকে আমরা লাঞ সেরে নিলাম পাশেই একটা হোটেলে এ,১১০ টাকায় ভাতের সাথে ৯ রকম পদ, আর কী দারুন রান্না ,আগে শুনেছিলাম যে ওড়িশার লোকেরা ভাল রান্না করে আজ তার প্রমান পেলাম। খেয়েনিয়ে গাড়ী তে এসে বসলাম গাড়ী চলতে শুরু করল,কিছুক্ষন পর আমরা পৌঁছেগেলাম কুুলডিহা, ওখানে প্রয়োজনীয় কাগজপএ দেখিয়ে প্রবেশ করলাম জঙ্গলে ,জঙ্গলের বুক চিরে গিয়েছে রাস্তা,চারদিকে ছোটছোট টিলা,নালা,আর সবুজের সমারহ। গাড়়ী চলছে আস্তে কানে আসছে নানাপাখীর আওয়াজ ,


জঙ্গলের যত গভীরে যাচ্ছি তত ভাল লাগেছ তত রোমাঞ্চিত হচ্ছি যেতে যেতে গাড়ীটা হঠাৎ থামল দেখি একটা গাছ রাস্তায় ভেঙ্গে পড়ে আছে, আমরা সকলে মিলে কোনো রকমে টেনেটেনে গাছটিকে সরালাম।এরপর ড্রাইভার আমাদের নিয়ে গেল একটা বিশাল জলাশয়ের ধারে,জলাশয়ে নানারকম পরিযায়ী পাখী আর শালুক ফুলে ভর্ত্তি,জলাশয়ের ধারে কাদায় উপর দেখতে পেলাম হাতির পা এর চিহ্ন ,তখন আমদের কাছে ভালো ক্যামেরা ছিলনা, যেটা ছিল সেটা দিয়ে কিছু ছবি ফ্রেমবন্দি করলাম।ওখান থেকে ড্রাইভার কাম গাইড নিয়ে গেল একটা ওয়াচ টাওয়ার এর কাছে কিন্তু গিয়ে দেখলাম গেটে তালা দেওয়া,এরপর ড্রাইভার আমাদের বলল নিচের দিকে একটা ছোট ঝরনা আর জলাশয় আছে ওখানে নাকি হাতির দল জল খেতে আসে কিন্তু ওখানে তো গাড়ী যাবেনা হেঁটে যেতে হবে আমরা রাজি হয়ে গেলাম। ওয়াচ টাওয়ার এর পাশ দিয়ে একটা রাস্তাটা নেমে গিয়েছে নিচের দিকে ওটা দিয়ে হাঁটছি, ঘন জঙ্গল ,কেও কোথাও নেই ,দুর থেকে ভেসে আসছে জল পড়ার শব্দ,বেশ ভয় ভয় লাগছে আবার ভালোও লাগছে,গিয়ে দেখলাম একটা ছোট ঝরনা নদির মত বয়ে চলেছে নিচের দিকে, সুন্দর জায়গা আমরা ওখানে 
অনেকক্ষন ঘুরলাম, কিছুই দেখতে পেলাম না ওখান থেকে আবার গাড়ী তে উঠে গেলাম একটা বন বাংলো র কাছে, কিছু পাখি আর বন্য কাঠবেড়ালী ছাড়া কিছুই দেখতে পেলাম না মনটা খুব খারাপ, এদিকে সন্ধে হয়ে আসছেে হোটেলে ফিরতে হবে ড্রাইভার গাড়ী ঘুরিয়ে নিল আসবার সময় হঠাৎ দেখি দুটো ভাল্লুক মারামারি করতে করতে গাড়ী র সামনে এসে পড়ল ,গাড়ী থেকে নামব কী নামবনা ভাবতে ভাবতে ভল্লুক গুলো জঙ্গল এর মধ্য ঢুকে গেল,যাক কিছু তো এক টা দেখা গেল ...এই ভেবে নিজেকে স্বান্তনা দিচ্ছি, এমন সময় আমাদের গাড়ী প্রচন্ড ঝাঁকুনিদিয়ে দাড়িয়ে গেল হঠাৎ দেখি একটি ময়ূর পেখম মেলে গাড়ীর সামনে এসে দাড়িয়ে , সত্যি মনটা ভরে গেল , ,আমরা তাড়াতাড়ি করে গাড়ী থেকে নামতে গেলাম আর ময়ূর টা বনের মধ্য মিলিয়ে গেল, আবার গাড়ী ছাড়ল ড্রাইভার আমাদের নিয়ে গেল আর একটা বন বাংলো তে,ওখানে যাওয়ার কিছুক্ষন পর আমরা হাতির ডাক শুনতে পেলাম ,মনে মনে খুব আনন্দ হচ্ছে ,এমন সময় কিছু টা দুরে দেখলাম এক এক করে ৮টা হাতি জড়ো হয়েছে,সাথে একটা বাচ্ছাও আছে ,হাতির দল টি প্রায় ১৫মিনিট ওখানে ছিল,বনে এসে কোনো বন্য প্রানী দেখার একটা অন্য রকম অনুভুতি আছে সেটা বুঝতে পারলাম ,সত্যি জঙ্গল আসা আজ সার্থক.....
কুলডিহা ফরেস্ট থেকে চাঁদিপুর ফিরতে আমাদের অনেক রাত হয়ে গেল,পরদিন খুব ভোরভোর উঠে গেলাম চাঁদিপুর বীচে ,চাঁদিপুরের বীচ বিশাল বড় ,সমুদ্র দেখতে গেলে অনেক দুর যেতে হবে , আজ কুয়াশায় চারদিক ভোরে গিয়েছে,কুয়াশা ঘেরা বৃস্তিন্য বীচ এক রকম রুপ আবার আস্তে আস্তে কুয়াশা সরে গিয়ে যখন সূর্য উঠল তখন সে এক আলাদা রুপ,চারিদিকে বালুকারাশি,বহু দুরে সমুদ্রের জলরাশি মরিচিকার মত চিকচিক করছে আর যখন জোয়ার আসছে তখন মনে হচ্ছে কোন এক জ্বলন্ত তরল পদার্থ ধীরে ধীরে আমাদের দিকে এগিয়ে আসছে ।সত্যি এক নতুন অভিজ্ঞতা....

ঘড়ি তে তখন ৯ টা আমরা ব্রেকফাস্ট করে একেবারে লাগেজ নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম আজ আমরা যাব দেবকুন্ড ওখান থেকে পঞলীঙ্গেস্বর,চাঁদিপুর থেকে দেবকুন্ড প্রায় ৯০ কিলো মিটার ।দেবকুন্ড হচ্ছে সিমিলিপল ফরেস্ট এর একটা
অংশ,গাড়ী তে যেতে যেতে দেখতে পাচ্ছি লাল মাটির রাস্তা ,সহজ সরল গ্রাম্য পরিবেশ,আমরা প্রায় দেবকুন্ড এর কাছাকাছি এসেগেছি চারি দিকে ছোটো ছোটো টিলার মত পাহাড়,আমাদের গাড়ী আস্তে আস্তে পাহাড়ে উঠছে, কিছুটা গিয়ে গাড়ী থামল আর যাবেনা এবার হেঁটে যেতে হবে প্রায় ১ কিমি,চারদিকে পাহাড়,জঙ্গল আর ঝরনার জলের আওয়াজ প্রকৃতির এক অপরুপ সৃষ্টি,আমরা জঙ্গল এর মধ্য দিয়ে যেতে যেতে কিছু জায়গায় হাতির পা এর চিহ্ন দেখতে পেলাম, স্থানীয় লোকদের জিজ্ঞাসা করলাম বলল হাতির দল মাঝেমাঝে ঝরনার জল খেতে আসে। হাঁটতে হাঁটতে আমরা এসে গেলাম দেবকুন্ড,পাহাড়ের উপরে অম্বিকা মাতার মন্দির ,মন্দিরের সামনে দিয়ে বয়ে চলেছে ঝরনা ,আর ঝরনার জল যেখানে পড়ছে সেখানে এক হ্রদ এর সৃষ্টি হয়েছে আর তার জল কাঁচের মত স্বচ্ছ ,দেখে আর থাকতে পারলাম না নেমে পড়লাম স্নান করতে ,ওরে বাবা কী ঠান্ডা জল,ঠান্ডা হলেও স্নান করে খুব আরাম লাগাল ।এবার যাব মন্দিরে , মন্দিরে যাওয়ার রাস্তাটাও বেশ অনেক গুলো সিঁড়ি ভেঙ্গে একটা পাহাড়ে উঠলাম তারপর কিছুটা গিয়ে আবার অন্য পাহাড়ে সিঁড়ি বেয়ে নেমে এলাম একদম মন্দিরের কাছে,গিয়ে দেখলাম পাহাড়ের উপরেও একটি হ্রদ তার পাশেই মন্দির,আর মন্দিরের পাশ দিয়ে ঝরনা নিচে পড়ছে ,আর উপর থেকে পুরো জায়গা টা দেখতে দারুন লাগছে এরপর অম্বিকা মাতার দর্শন করে গাড়ীরদিকে রওনা দিলাম,ঘোরার নেশায় এতই বুঁদ হোয়ে ছিলাম যে খাওয়ার কথা ভুলেই গেছি ।ঘড়িতে তখন ৪ টে বাজে কোথাও আর খাবার পাওয়া যাচ্ছেনা ,পাহাড় থেকে নিচে নেমে কিছু দুর যাওয়ার পর অবশেষে এক জায়গায় কিছু পাওয়া গেল, তাই খেয়ে গাড়ী তে উঠে পড়লাম..... এখান থেকে আমরা যাব পঞলিঙ্গেশ্বর।

সন্ধে ৭ টার মধ্য আমরা পঞলিঙ্গেশ্বর পৌঁছেগেলাম ,এখানে আমাদের হোটেল বুক করাছিলনা,
অনেক খোঁজাখুজির পর অবশেষে পাওয়া গেল, হোটেলে গিয়ে খেয়ে দেয়ে লম্বা ঘুম ,সকালে উঠে দেখলাম তাল গাছের মাথার উপর সূর্যি মামা উঁকি দিচ্ছে,আমাদের হোটেলটাও বেশ দারুন জায়গায় একদিকে তাল গাছের সারি সামনে সবুজ গালিচার মত ফাঁকা লন, চারদিকে ফুল গাছে ভরা , দুরে দেখা যাচ্ছে একটি পাহাড়, ওই পাহাড়ের উপরেই পঞলিঙ্গেশ্বর মন্দির , তার মাঝে ছোট্টো দুচালা ঘর আর জায়গাটা একদম নিরিবিলি একদম মনোরম পরিবেশ,তাড়াতাড়ি স্নান সেরে কিছু খেয়ে বেরিয়ে পড়লাম পঞলিঙ্গেশ্বর মন্দির এ পাহাড়ের সামনে সারি দিয়ে দোকান হরেক রকমের জিনিস বিক্রি হচ্ছে,অনেকগুলি সিড়ি বেয়ে উপরে উঠলাম, একটি গাছের নিচে ছোট্টো গুহার মধ্য জলের স্রোত বইছে ওই জলের নিচে পাঁচ টি শিবলিঙ্গ সেই নাম অনুসারে এর নাম পঞলিঙ্গেশ্বর।শিবলিঙ্গ দর্শন করে আমরা উঠলাম একদম পাহাড়ের চুড়ায় সেখান থেকে পুরো গ্রাম টা দেখা যায়,এখানে আরো কিছু দেখার ছিল কিন্তু হাতে সময় নেই এবার ফেরার পালা ,মন টা খারাপ আবার সেই একঘেয়ে জীবন কিন্তু কী আর করা যাবে !!!!হোটেলে ফিরে লাঞ করে স্টেশনের দিকে পা বাড়ালাম ।