image description

Mousuni Island

এবারের নববর্ষে একটু অন্য রকম ভাবে কাটাব বলে আমরা কয়েক জন বন্ধু মিলে একটা পরিকল্পনা করে ফেললাম। ভ্রমণ যেহেতু আমাদের মনের মনি কোঠায়, কাজেই এই অন্য রকম ভাবে কাটানো মানেই নতুন একটি জায়গার আবিষ্কার। যেমন ভাবনা তেমনি কাজ, চৈত্র সংক্রান্তির ভোরে আমরা কয়েক জন মিলে শিয়ালদহ স্টেশন হাজির হয়ে গেলাম। 5.15 am এর নামখানা লোকাল এর প্রথম বগিতে আমরা লোটা-কম্বল নিয়ে জানলার ধার ধরে কয়েকটি জায়গা দখল করে আমাদের সফর নামা শুরু। তিন ঘন্টা দক্ষিণ 24 পরগণার গ্রাম বাংলা মাঠ ঘাট ফুল ফল পাখি দেখতে দেখতে আমরা নামখানা পৌঁছে গেলাম। এরপর আধুনিক যান টোটো করে আমরা পৌঁছেগেলাম হাতানিয়া-দোয়ানিয়া নদীর ঘাটে, এখানে বলে রাখি এই নদী vasel এ করে যে কোন মোটর গাড়ি পারাপার করা যায়। নদী পারের পর আমরা পৌঁছে গেলাম স্ট্যান্ডে এবং এখান থেকে টাটা ম্যাজিক বা মারুতি ওমনি গাড়ি নিয়ে 30 মিনিট পথ অতিক্রম করে দুর্গাপুর ঘাট। এরপর আরও একটি নদী "চিনাই" পার করে বাগডাঙ্গা ঘাট মানে মৌশুনি দ্বীপে আমাদের পা পড়লো। আমরা তখন উচ্ছল, কিন্তু এখনোও কিছুটা পথ বাকি। অবশেষে লাদেন ভ্যানে 7 কিমি পথ পাড়ি দিয়ে দ্বীপের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত আমাদের গন্তব্য সাগর তীরের তাঁবু, সামনা সামনি হাজির আমরা কয়েকজন। মন তখন চঞ্চল। আর বলে রাখি এই দ্বীপের পথটুকু এক অজানা বাংলার সন্ধান সঙ্গে সূর্যমুখীর খেত মন ভালো করে দিয়ে যায়।


চঞ্চল মন তখন আমাদের 24 ঘন্টার আস্তানাকে সরেজমিনে পরখ করে চলেছে। দুটি তাঁবুর আয়োজন বাবলা গাছের সারির মাঝে। সামনে গাছের সারির ফাঁক দিয়ে সাগর ডাকে আয় চলে আয়। সঙ্গে রয়েছে পাখিদেরই কিচির মিচির। আর আছে গাছের ডালে ঝোলানো দড়ি দিয়ে বোনা দোলনা (হ্যামোক) যাতে ক্লান্ত শরীর পাবে শীতলতার খোঁজ। ইতিমধ্যে আমাদের পাতিলেবুর শরবতে প্রাণ ঠান্ডা হয়ে গেছে। এরপর একটু জিরিয়ে সমুদ্র দাপাদাপি। সাগর-নদী ঘিরে যে জীবন চরিত তার সাথে জুড়ে গেলাম আমরাও। বাগদা মীন এর জন্য জাল টানা থেকে শুরু করে সংগ্রহ, সে এক জীবন সংগ্রাম আর সেই সংগ্রামের সাক্ষী হয়ে রয়ে গেলাম আমরা শহুরে কয়েকজন। ছোট্ট শিশুদের বালিঘর ভাসিয়ে নিয়ে যায় সমুদ্র তার সাদা ফেনা ধরা ঢেউ এর টানে। খুঁজে পাই যেন ফেলে আসা ছেলেবেলা। এরপর আসে দুপুরের মোটা চালের ভাত আর তরিতরকারি মাছ যা কিনা স্বাদেগুনে অসাধারণ এবং রান্নার পদ্ধতি একান্ত আপন বাংলার ঘরানা। খামোকা দুপুরে সাগরবায়ু সেবন এবং পাখিদের গান বাজনা। কখন যে দুপুর গড়িয়ে বিকেল এলো সূর্য মামা জানান দিলো গাছের ফাঁকে অস্ত গিয়ে। বালির চরে এপ্রান্ত থেকে অপ্রান্তে হেঁটে সন্ধ্যে যখন ঢোললো পড়ে ঠিক সেই সময়ই মুড়ির সাথে পিয়াজি দিয়ে চায়ের কাপে তুফান তুলে আড্ডা তখন জমে ক্ষীর। এরপরেই আবার আসে কাঁকড়া ঝাল যার স্বাদ এখনো জিভের ডগায়। অন্ধকারের মাঝেই যেন আকাশ ভরা তারার মেলা, আর সেই মেলাতেই আমাদেরই গানের ভেলা সাগর পারে। হটাৎ দেখি পুব আকাশে বরুণ দেবের রোষ। মৌশুনি দ্বীপ যেন শান্ত থেকে এক বীভৎস রূপে সজ্জিত। আমরা কজন শহুরে প্রাণ ইষ্ট নামে জপে মন। আমি তখন প্রকৃতির এই রুষ্ট রূপে প্রেমে পাগল। কিছুজন নিরাপদ আশ্রয়ে গেলেও আমরা দুজন সেই পাগল করা কালবৈশাখীর সঙ্গে রইলাম তাঁবুর মাঝে। সময় যায় শান্ত হয় ঝড়। ইতিমধ্যে বালি আমাদের ভিজিয়ে দিয়েছে তার কনা দিয়ে। রাতের খাবার টেবিলে রুটি আর দেশী মুরগির মাংস যেন মনে হয় অমৃত। সারাদিনের কর্ম হলো সাঙ্গ। এবার আমাদের তাঁবুর মাঝে নিদ্রা দেবীর আরাধনা। বলে রাখা ভালো মৌশুনি দ্বীপে কোন বৈদ্যুতিক আলো নাই, যা ব্যবস্থা সবই সোলার সিস্টেম এবং যৎসামান্য।



পাখিদেরই ডাকে নববর্ষের ভোর আমাদের অভ্যর্থনা জানায়। আমরা চলে যাই নদীর মোহনায় সাগর তীর ধরে আর পাখিদের হাতছানি আমাদের সঙ্গে থাকে। সূর্য পুব আকাশ লাল করে রাঙিয়ে দিয়ে নতুন বছরকে ভালো থাকার অঙ্গীকার জানিয়ে যায়। এরপরে তাঁবুতে ফিরে লুচি আলুরদম যোগে প্রাতঃরাশ সেরে হ্যামোকে শরীর এলিয়ে, পেরিয়ে আসা বছরের জমা ক্ষতির হিসাব নিয়ে মন কেমন করে ওঠে। এদিকে সময় গড়িয়ে যায়। ফিরে যেতে হবে শহুরে জীবনে। মন চায় এই দ্বীপের অন্তরে হারিয়ে যেতে, কিন্তু উপায় কই? ভালো থেকো মৌশুনি দ্বীপ। ভালো থেকো নদীমাতৃক জীবন চরিত। ভালো থেকো গাছে ঘেরা তাঁবু। ভালো থেকো পাখির কুজন। ভালো থেকো সাগর জল। আবার আসব ফিরে সুযোগ পেলে।