image description

Lepchajagat

চ্যাপ্টা ঠোঁটের ভালোবাসা,
খুদে চোখে কত আশা, 
যখন তখন সাদা কুয়াশা....

কতবার যে অঞ্জন দত্তের এই গানটা শুনেছি আর কতবার যে মনে মনে দার্জেলিং চলেগেছি বলতে পারবো না। এবার ঘুরে এলাম লেপচাজগত। দার্জেলিং থেকে ১৪ কিলো মিটার দূরত্বের একটি পাহাড়ি গ্রাম। চার তারিখ ভোর তিনটের সময় NJP তে পৌঁছালাম। আমাদের হোমস্টের মালিক লামা জি আগে থেকেই গাড়ি ঠিক করে রেখে ছিল। ভোর চারটের সময় গাড়ি আসার কথা ছিল। তবে আশা করেছিলাম হয়তো ভোর ছটা বাজিয়ে দেবে। প্রথম অবাক হলাম যখন রাত দুটোর সময় ড্রাইভার ফোন করলো 'স্যার হাম নিকাল গেয়ে' ঠিক ভোরবেলা চারটের সময় হাসিমুখে ছোটখাটো চেহারার তামাং জি এসে হাজির গাড়ি নিয়ে। যাত্রা শুরু হলো আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথ দিয়ে এগিয়ে চললাম। কখন একরাশ মেঘ এসে ঘিরে ধরছে আবার কখন ঝলমলে রোদুর। ঘুম স্টেশনে আসা মাত্র লামা জির ফোন 'ওয়েলকাম স্যার ' পথের সমস্ত ক্লান্তি এক লহমায় দূর হয়ে গেল। ঘুম স্টেশন থেকে বাঁদিকে যে রাস্তাটা চলে গেছে সেটাই সোজা যাচ্ছে লেপচাজগত, রাস্তা দুইধারে পাইন ও রডডেনড্রোন এর ঘন নিবিড় অরণ্য। খুব বেশি হলে হয়ত গোটা তিরিশেক বাড়ি রয়েছে। জীবনযাত্রা খুবই সাধারণ ও নিরুপ্রদব। আমি নিজে বড়াবড়ি খুবই শান্ত স্নিগ্ধ নিরিবিলি পরিবেশ পছন্দ করি। ঠিক যেমন পছন্দ তেমন জায়গায় বটে। প্রকৃতি যেন নিজের হাতে ঢেলে সাজিয়েছে, ঘন পাইন বন এর নিস্তব্ধতা ভেদ করে দিচ্ছে পাখির কিচির মিচির। আবার কখন মেঘরাশি এসে ঘিরে ধরছে সঙ্গে দোসর হয়েছে ঠান্ডা বাতাস। গ্রামের মধ্যেই রয়েছে একটি ভিউ পয়েন্ট একশো মিটার মত ওপরে উঠতে হবে। আকাশ পরিষ্কার থাকলে কাঞ্চনজঙ্ঘা দর্শন হতে পারে। অবশ্য নাহলেও ক্ষতি নেই সকালের দার্জিলিং শহর, পাখির কিচিরমিচির, ঠান্ডা বাতাস আর নিচ থেকে ভেসে আসা কোনো নেপালি গানের সুর আপনার মন ভালো করবে নিশ্চিত। তবে আমি রাত দশ টার সময় দুদিন উঠেছিলাম যদিও লামা জি যেতে মানা করেছিল কিন্তু যা দেখলাম তাও এ জন্মে ভুলবার নয়। এক দারুন নিস্তব্ধতা, এক আকাশ ভর্তি তারা আর নীচে দার্জেলিং শহরের অসংখ্য টিমটিম করে জ্বলা আলোক বিন্দু, মনে হচ্ছিল যেন আকাশ ও স্থল এই জায়গায় এসে একসাথে মিশে গেছে এবং একটা বৃত্তের সৃষ্টি করেছে। তবে বলে রাখা ভালো মোবাইল নেটওয়ার্ক কিন্তু ভালো না, বাইরের পৃথিবীর সাথে সমস্ত যোগাযোগ আপনার ছিন্ন হতে পারে।

আর একটা কথা এখানকার লোকেদের হাসিমুখের মিষ্টি ব্যবহার আপনার মন জয় করবেই, এদের মধ্যে কখনও কোনো বিরক্তি নেই। আপনি যা চাইবেন হাসিমুখে এনারা পরিবেশন করবে। সকাল সন্ধ্যে মিলিয়ে প্রায় তিন চার জায়গায় আমাদের চায়ের আসর বসত। কখন লামাজির বাড়ি অথবা কখন তামাং জির স্ত্রীর হাতের তৈরী গ্রীন টি সঙ্গে আলু পকোড়া। ভোলা সম্ভব নয়। আর সন্ধ্যে বেলায় লামজির রান্না ঘরে বসে স্থানীয় পানিয়ের স্বাদও ভুলবার নয়।আপনার জন্য সবসময় হাসিমুখে তৈরি এই মানুষ গুলো যখন যা আবদার করেছি পেয়েছি। এই সহজ সরল মানুষগুলি অল্পতেই খুশি, বেশি চাওয়া পাওয়া নেই।