image description

শিমুলতলা জজমজমাট

ভোর ৬টা ০৫ এর হাওড়া -রাঁচি শতাব্দী তে কোনরকমে পা রেখে ভাবলাম যাক যাওয়াটা তাহলে শেষমেশ হতে চলেছে।কিন্তু তখনও কি জানতাম আমাদের জন্য আসানসোল স্টেশনে কি দুর্ভোগ অপেক্ষা করে আছে!!!গুচ্ছের ফটোতে পোজ দিতে দিতে যখন আসানসোল নামলাম ঘড়িতে তখন ৮টা ২০ বেজে গেছে।
আসানসোল থেকে ৯:৩০ এর ঝাঁঝাঁ প্যাসেঞ্জার ধরব। হাতে অফুরান সময়।।আমার কর্তা আর বন্ধুর কর্তা টিকিট কাটতে যাবেন।।কি মনে করে বন্ধু প্ল্যাটফর্ম এ দাঁড়িয়ে থাকা ট্রেনের গন্তব্য জানতে চাইলে গার্ড বললেন "ঝাঁঝাঁ প্যাসেঞ্জার। লেকিন আজ ঝাঁঝাঁ তক নেহি যায়েগী।ব্লক হ্যায়"।
বন্ধু শুধাইল ৯:৩০ টায় ছাড়বে তো।
নেহী সাড়ে আট বাজে।ঔর ইয়ে এক হি ট্রেন হ্যায়।
কি??? ????????????
নিজের মাথার চুল নিজের হাতে ছিঁড়তে ইচ্ছে করছে।।কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা খরচ করে শতাব্দী ট্রেন, এত লাফ ঝাঁপ করে এতদূর এসে যাওয়া হবে না!!!
টিকিট কাটতে কাটতে তো তো ট্রেন ভোকাট্টা হয়ে যাবে।।????????????
আমাদের এই ন যযৌ ন তস্থৌ অবস্থায় মুশকিল আসান হলেন গার্ড।আমাদের কাঁদো কাঁদো মুখ দেখে দয়া হল বোধহয়।বললেন যান টিকিট কেটে আনুন।ট্রেন দাঁড়িয়ে থাকবে।
হ্যাঁ??????????????????????? 
যাহ এরকম আবার হয় নাকি??কর্তারা আর দেরী করলেন না।।টিকিট সমেত ট্রেনে চড়ে বসলাম।তখনও ঘোর কাটেনি আমাদের।গোটা ট্রেনে গুটি কয়েক লোক।।আর সে ট্রেন।কি আর বলব। যাচ্ছে তো যাচ্ছেই।।দাঁড়াচ্ছে তো দাঁড়াচ্ছেই।।
৩:৩০ ঘন্টার রাস্তা সবুরে মেওয়া ফলিয়ে ট্রেন যশিডি পৌঁছাল ২:৩০ নাগাদ।।আর যাবেনা ট্রেন।।অগত্যা অটোই ভরসা।পাহাড়ের কোল ঘেঁষে কালো ধোঁওয়া আর ভটভট শব্দে চলছে অটো।বড় রাস্তা ছেড়ে চিকচিকে বালির উপর দিয়ে যাচ্ছি।।মাঝে মাঝে আবার তিরতিরে নদী।বেচারা অটো যে কোন সময় দেহ রাখতে পারেন।মাঝে মাঝেই অটো থেকে নেমে ঠেলে দিতে হচ্ছে।।পায়ে কিচকিচে বালি তায় নদীর জল সব মিলিয়ে অদ্ভুত অভিজ্ঞতা।ঘড়িতে ৫:৩০। শেষ অব্ধি পৌঁছেই গেলাম।রাস্তার এত ভোগান্তি,ক্লান্তি এক নিমেষে হাওয়া।
ঠিক ছিল আমার এক ছাত্রের বাড়িতে থাকব।আগে থেকে সব ঠিক করা ছিল।।স্টেশনে পৌঁছে ফোন করলাম কেয়ারটেকার কানাইদাকে।(তবে এখন চাইলে নাম্বার দিতে পারব না।।কারণ তিনি আর ইহজগতে নেই)একগাল হেসে মাথা চুলকে দাদা বললেন, রাম রাম দিদি ওই বাড়ি বুক হয়ে গেছে আমি আপনাদের অন্য বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছি।মনে মনে কানাইদার মুন্ডপাত আর মুখে আচ্ছা আচ্ছা ঠিক আছে বলে যাচ্ছি।।সন্ধ্যে হবে হবে। ঠান্ডা হাওয়ার চাদর জড়িয়ে ধরছে শরীর।গোধূলি লগ্নে আলোয় আকাশটা সিঁদুররাঙা। বাড়িটায় পৌঁছন গেল।দুটো ঘর।ঢুকে গেলাম যে যার ঘরে
খানিক বাদে বন্ধুর চিল চিৎকার।।
কি হয়েছে রে??
আমি এখানে থাকব না।
মানে কেন?
কমোডে। নোংরা।
বোজো কান্ড।
সে তো নাছোড়। বেরিয়ে পড়েছে ব্যাগ নিয়ে।। ফিরতি ট্রেনে বাড়ি ফিরে যাবে বলে হুমকি দিচ্ছে।
সবাই মিলে বোঝাচ্ছি এমন সময় মনে পড়ল রাস্তায় আসতে একটা হোটেল দেখেছিলাম না।।ব্যাস ছুটলাম সে দিকে।স্টেশন থেকে আড়াই তিন কিমির পথ।চড়াই উতরাই।।পা গুলো বিদ্রোহ করছে।কিন্তু আমার সে বন্ধুকে আমি বড় ভালবাসি।তাই কুছ পরোয়া নেহি।।আকাশের আলো ফুরিয়েছে।দুদিক আবছা।জংগলের মাঝে পথ।দুদিকে মাঝে মাঝে পোড়ো বাড়ি।খানিকবাদে শিবরাত্রির সলতে অন্যা রিসোর্ট।চারপাশে লোকবসতি নেই,উল্টোদিকে একটা বাড়ি দুমড়ে মুচড়ে,ঝুলে পড়া কড়ি বরগা,ভাংগা সিঁড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে না থাকার মত করে।এখানে বলে রাখি স্টেশন ছাড়া এখানে কোথাও ইলেক্ট্রিসিটি নেই।জেনারেটর আর সৌরবিদ্যুৎ ভরসা।তাই ভাড়া কিঞ্চিত বেশি।দরাদরি করে ফোর বেডেড রুম ৭০০ টাকায় ঠিক হল(আলাদা রুমে থাকার মত সাহস সত্যি ছিল না)বন্ধুর পছন্দ হয়েছে ঘর।আমরা ফ্রেশ হয়ে ছাদে উঠলাম।চারিদিকে ঝিঁঝিঁ র ডাক,রিসোর্টের পর থেকে দিগন্ত বিস্তৃত সাদা বালি,তিরতিরে নদীর উপর চাঁদের আলোয় সে রূপোলি,মোহময়ী।বিভূতি বাবুর আরণ্যক যেন জীবন্ত হয়ে উঠছে ধীরে ধীরে।।আস্তে আস্তে জমে উঠল তেনাদের গল্প।ওই, রাতে যাদের নাম করতে নেই। ভয়ে নেমে এলাম ছাদ থেকে।নেমে এসে তেনাদের দেখা না পেলেও হাজার হাজার শ্যামা পোকা দেখি ঘরে বসে আছে বহাল তবিয়তে।হোটেলের লোকের কথায় আলো বন্ধ করে বাইরে আগুন জ্বালাতেই তারা ঝাঁপ দিলেন আগুনে।খেয়ে নিয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম আস্তে আস্তে।

সকালে উঠে তৈরি হয়ে বেরোলাম।হোটেল থেকেই অটো বলা ছিল।যাচ্ছি লাট্টু পাহাড়ের দিকে,পাহাড়ের কোল ঘেঁষে যেতে যেতে বন্ধু আমার হাত ধরে বলল,চলে গেলে বড় ভুল করতাম রে।।আহা হা কি সুন্দর প্রকৃতি। সাধে কি বলে হাওয়া বদল।লাট্টু পাহাড়ের আগে পড়ল চঞ্চল -----নদী,তাতে আবার লাফিয়ে পড়া ঝর্ণা।গায়ে মুখে ছিটে আসছে জলের কণা।নদীর তলা পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে সব
কাটালাম বেশ খানিক্ষণ।।এবার লাট্টু পাহাড়।উঠে পড়লাম উপরে।সামনে রাজবাড়ি সহ দুর্দান্ত প্যানোরামিক ভিউ।বন্ধু,তার কর্তা,আমার কর্তা উঠলেন না।নেমে এলাম একা একা।উল্টোদিকের রাজবাড়ির দিকে যাচ্ছি।শুনলাম এটা নাকি বর্ধমান রাজার বাড়ি(ভুল হতে পারে এটা) এ এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা।গায়ে কাঁটা দিচ্ছে।রাজা নেই রাজত্ব নেই,রাণী নেই,বাঈজী নেই।কেবল সে বাড়ি দাঁড়িয়ে আছে স্মৃতিভারে নুব্জ হয়ে।ভারাক্রান্ত মনে ফিরতে হল।আরো খানিক এদিক ওদিক ঘুরে স্টেশনে এলাম খেতে।বেলা ৩টে।খাবার তেমন না থাকলেও আতিথেয়তা নিরন্তর।৩০টাকা মাথাপিছুতে গলা অব্ধি খেয়ে নড়তে পারছি না আর।দোকানি বলল জল খেয়ে নিন কল থেকে।।নিলাম খেয়ে।।খানিক বাদেই ম্যাজিক হচ্ছে।পেট হালকা হয়ে যাচ্ছে আস্তে আস্তে।হোটেলে ফেরার পথে সাইকেল সারানোর দোকান থেকে দুটো সাইকেল ভাড়া করলাম(সেই গোয়ায় গিয়ে বাইক ভাড়া নেবার মত)কারণ রাতে আবার স্টেশনে আসব মাংস কিনতে।রাস্তায় যেতে যেতে পোড়ো বাড়ি গুলোতে ঢুকলাম।কুকুর আর বাদুড় ছাড়া কেউ পথ আটকাল না।দরজা ক্যাঁচ ক্যাঁচ আওয়াজে খুলে গেল সামান্য ঠেলতেই।নাহ আর সাহসে কুলোল না।ফিরে এলাম হোটেলে।।খানিক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে বেরোলাম সাইকেল নিয়ে।হায় হায়।।চলে না রে চলে না।।সাইকেল আর চলে না।অগত্যা সাইকেল হাঁটিয়ে নিয়ে যাচ্ছি।কোজাগরীর চাঁদের আলোতেও ঘুরঘুট্টি অন্ধকার।।ভূত এবং মানুষ কে যে এসে গলা টিপে ধরবে এই ভয়ে রামনাম জপছি।।স্টেশনে গিয়ে ফিরিয়ে দিলাম সাইকেল দোকানির অমূল্য সম্পদ।।মাংস,চীপ্স,ক্লোল্ড ড্রিনক কিনে ফিরছি।হোটেলের হেঁসেলে মাংস রাঁধবে বন্ধু।সবার নেমন্তন্ন।যাক ফিরছি এবার।।তৈরি হতে চলেছে আমাদের জীবনের ইতিহাস।।রাত ৭:৩০ (হুম গভীর রাত বললেও ভুল হবে না)চরম গা ছমছমে পরিবেশ। যাচ্ছি চারজন ঘেঁষাঘেঁষি করে।হঠাৎ বন্ধু আঁ আঁ করে উঠল।। কি হয়েছে কি হয়েছে বলতে বলতেই সে আঙুল তুলে দিল সামনে।দেখি পোড়ো বাড়ির সামনে দুটো ছায়ামূর্তি। আমাদের ভয় পেতে দেখে ছায়ামূর্তি রা হা হা করে আওয়াজ করছে।।বন্ধু অজ্ঞান হব হব 
আমিও কাটা কলাগাছ হব হব এমন সময় আমার কর্তা বললেন আরে ও দুটো মানুষ।আমাদের মত বেড়াতে এসেছে।লজ্জায় ছুট।বেশ ভয় পেয়ে গেছি।বন্ধুর বর গায়ত্রি মন্ত্র জপতে জপতে বাকি রাস্তা টুকু কাটিয়ে দিল।হোটেলে ফিরে বন্ধুর হাতের দুর্দান্ত ওয়াইন দেওয়া মাংস খেয়ে ঘুমিয়ে গেলাম মড়ার মত।
সকালে উঠেছি।।বেশ ঠান্ডা। কাঁচের জানলায় টুপ্টাপ শিশির পড়ছে।বাইরে ধোঁয়ার মত ঘন কুয়াশা।যাওয়ার সময় হয়ে এসেছে।তৈরি হয়ে নিলাম।স্টেশন যাওয়ার পথে একটা বাস পেলাম।
দাদা ভাড়া কত?
আরে এইটুকু রাস্তার জন্য কি ভাড়া নেব?
মানে?আসলে এইটুকু রাস্তা এখানে কেউ বাসে চড়ে না হেঁটেই যায়।
বলেন কি এত রাস্তা হেঁটে!!
বুঝলাম এদের কাছে বাসে চড়াটা নিতান্তই বিলাসিতা।
নাহ ভাড়া নিলেন না কন্ডাকটর। 
গতকালের হোটেলেই খেয়ে নিলাম।সময়মতই ট্রেন এল।শিমুলতলাকে টা টা বাই বাই করে ১০:৩০ নাগাদ ট্রেনে উঠলাম।

কোজাগরীর গোল চাঁদ,দুদিকে মহুয়ার গাছ 
খোলা আকাশ,কোজাগরী রাতের চিকচিকে বালির উপর রূপোলি নদী,লাট্টু পাহাড়,ভগ্নপ্রায় রাজবাড়ি,স্বাস্থ্যকর জল,সহজ সরল মানুষ,আর তার সাথে গা ছমছমে ভূতুড়ে রাস্তা, সব মিলিয়ে শিমুলতলা জমজমাট।

বি:দ্র:-রিসার্ভেশন থাকা সত্ত্বেও আসানসোল অবধি দাঁড়িয়েই আসতে হল।।
আর এটা ২০১৩ সালের কথা।এখন কিছু পরিবর্তন হয়ে থাকতেই পারে।
ওহ।।ঠিক ভালো ক্যামেরার অভাবে ছবি গুলো খুব একটা জীবন্ত হয়নি।