image description

The story of Murshidabad


নবাব আলিবর্দী খাঁ-র মৃত্যুর পর (১৭৫৬) মুর্শিদাবাদের সিংহাসন ও বিপুল ধনসম্পদের উত্তরাধিকার নিয়ে শুরু হয় প্রচন্ড সংগ্রাম, বিবাদ এবং সংঘাত। নবাব আলিবর্দী খাঁ-র জ্যেষ্ঠা কন্যা ঘসেটি বেগম ছিলেন নিঃসন্তান। তিনি আলিবর্দীর অপর কন্যা আমিনা বেগমের পুত্র সিরাজ উদ্ দৌল্লার কনিষ্ঠ ভ্রাতা এক্রাম উদ্ দৌল্লাকে পুত্র রূপে গ্রহণ করেন। ঘসেটি বেগমের ইচ্ছা ছিল তাঁর পালিত পুত্র এক্রাম মুর্শিদাবাদের সিংহাসনে অধিষ্টিত হোক। কিন্তু নবাব আলিবর্দী জীবিতকালেই প্রিয় দৌহিত্র সিরাজ উদ্ দৌল্লাকে নবাব নাজিম হিসাবে মনোনীত করেন। ঘসেটি বেগম মেনে নিতে পারলেননা এই সিদ্ধান্ত। তাই তখন সিরাজের ধ্বংসই ছিল তাঁর একমাত্র কাম্য। তিনি লিপ্ত হলেন সিরাজের বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্রে। তাঁকে সাহায্য করলেন নবাব আলিবর্দী খাঁর ভগ্নিপতি মীরজাফর, ধনকুবের জগৎ শেঠ, রাজবল্লভ এবং উমিচাঁদ। ষড়যন্ত্রীদের কুচক্রান্তে এবং মীরজাফরের বিশ্বাসঘাতকতার ফলে বহু পরিমাণে সৈন্য সামন্ত, কামান, গোলাবারুদ এবং দেওয়ান রায়দুর্লভ ও মোহনলাল ও মীরমদনের মতো বিশ্বস্ত অনুচর থাকা সত্ত্বেও ২৩শে জুন, ১৭৫৭ খ্রীঃ এ পলাশীর যুদ্ধে ইংরেজদের কাছে পরাজয় বরণ করেন নবাব সিরাজ উদ্ দৌল্লা।


সিরাজের বড় ইচ্ছা ছিল বেঁচে থাকার। আলিবর্দীর পর সবে এক বছর নবাব হয়েছেন তিনি। স্বপ্ন ছিল আবার ফিরে এসে মসনদ দখল করবেন। কিন্তু হায় ! সে আশা যে দুরাশাই রয়ে গেল। ১৭৫৭ সালের ২৪শে জুন পলাশীর যুদ্ধে পরাজয়ের পর প্রিয় বেগম লুৎফাউন্নিসা আর তাঁর ৪বছরের শিশুকন্যা উসমাৎ জহুরাকে নিয়ে মনসুরগঞ্জের হীরাঝিল প্রাসাদ থেকে নৌকো চড়ে পালিয়ে যান সিরাজ। রাজমহল যাবার পথে ভগবানগোলার কাছে কোন এক ঘাটে দানা সাহেব নামে এক ফকির চিনতে পারেন সিরাজকে। নবাবী পোষাক, জরির জুতো আর নবাবী মেজাজ- চিনতে ভুল করেননি ফকির। খবর যায় মীরজাফরের পুত্র মীরন, জামাই মীরকাশিম এবং রাজমহলের ফৌজদার মীরজাফরের ভাই মীরদাউদের কাছে। বন্দী হলেন সিরাজ। কি মর্মান্তিক ! গঙ্গার ফেরিঘাট থেকে নবাব সিরাজ উদ্ দৌল্লাকে হাতকড়া পরিয়ে রাস্তার দুপাশে দাঁড়িয়ে থাকা প্রচুর জনতার মধ্য দিয়ে নিয়ে আসা হয় জাফরাগঞ্জ প্রাসাদে। যেখানে বাস করতেন মীরজাফর স্বয়ং। পিছনে বেগম লুৎফাউন্নিসা এবং শিশুকন্যা উসমাৎ জহুরা। শোনা যায় লর্ড ক্লাইভ মীরজাফরকে পরামর্শ দিয়েছিলেন যে তাঁর সাথে কথা না বলে যেন সিরাজের ব্যাপারে কোনরকম সিদ্ধান্ত না নেওয়া হয়। কিন্তু কে শোনে কার কথা। ১৭৫৭ সালের ২রা জুলাই মধ্যরাতে মীরজাফরের পুত্র মীরনের আদেশে মহম্মদী বেগ শিরচ্ছেদ করে সিরাজের। মহম্মদী বেগ ছিল সিরাজের সমবয়সী এবং বাল্যবন্ধু। সিরাজের মা আমিনা বেগম তাঁকে নিজের ছেলের মতো করে মানুষ করেন। তাইতো বন্দী সিরাজ মহম্মদী বেগকে দেখে চমকে ওঠেন আর বলে ওঠেন, তুমি ! মহম্মদী বেগ ???


সেই জাফরাগঞ্জ প্রাসাদ। মীরজাফরের প্রাসাদ। স্থানীয় লোকেরা একে বলে নেমকহারাম দেউড়ি , মানে দরজা।
পরদিন হাতির পিঠে সিরাজের মৃতদেহ চড়িয়ে ঘোরানো হয় মুর্শিদাবাদের রাস্তায়। উফ্ কি ভয়ানক নৃশংসতা !!!
সিরাজের মৃত্যুর পর বেগম লুৎফা মীরজাফরের হারেমে যেতে অস্বীকার করেন তাই তাঁকে ঢাকায় নির্বাসিত করা হয়। পরবর্তীকালে লর্ড ক্লাইভের হস্তক্ষেপে ফিরে আসেন মুর্শিদাবাদে। ফিরে আসার পর খোশবাগের দেখাশোনার দায়িত্ব তাঁর উপর অর্পিত হয়।


খোশবাগ। যার নামের অর্থ আনন্দ বাগিচা। ভাগীরথীর পশ্চিমদিকে ১মাইল পথ পেরোলেই পৌঁছানো যায় খোশবাগ। এটি তৈরী করেন নবাব আলিবর্দী খাঁ। এর সুরক্ষার জন্য চতুর্দিক উঁচু প্রাচীর বেষ্টিত এবং নানা প্রকার মনোরম পুষ্প দ্বারা শোভিত। এখানে চিরশায়িত আছেন নবাব আলিবর্দী খাঁ, বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজ উদ্দৌল্লা এবং তাঁর পরিবারবর্গ। সিরাজের প্রিয়তমা পত্নী লুৎফাউন্নিসা তাঁর মাসিক বৃত্তির ১০০০ টাকা খোসবাগ রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ব্যয় করতেন। প্রতিদিন বিকেলে গোলাপ দিয়ে সাজিয়ে তুলতেন সিরাজের সমাধি। চিরাগ জ্বালিয়ে লুটিয়ে পড়ে কাঁদতেন সিরাজের সমাধির ওপর। এখানে ভাগীরথীর তীরে বসে তিনি ভাবতেন হীরাঝিলে তাঁর ও সিরাজের প্রেম কাহিনী। ১৭৮৬ সালে তাঁর মৃত্যু হলে তাঁর স্থান হয় সিরাজের সমাধির পায়ের কাছে। খোশবাগে এসে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজ উদ্ দৌল্লার সমাধির সামনে দাঁড়িয়ে যেন এক উপলব্ধির সাক্ষী হয়ে থাকলাম।