image description

Journey to Bhutan


১২ই মে ২০১৮ শিয়ালদহ স্টেশন থেকে হল আমাদের যাত্রা শুরু।আমরা ৫ জন পাড়ি দিলাম “ল্যান্ড অফ ঠাণ্ডার ড্রাগন” এর উদ্যেশ্যে।ঘরের পাশেই অন্য একটি দেশ।এই যাত্রার সবারই প্রথম বিদেশ ভ্রমন। তাই উৎসাহও প্রচুর।রাত ৮.৩০ টায় কাঞ্চনকন্যা এক্সপ্রেস এ চেপে শুরু হলো আমাদের যাত্রা।শনি রবি ইমিগ্রেশন অফিস বন্ধ থাকায় সোমবার অবধি আমাদের অপেক্ষা করতে হবে।যাই হোক জঙ্গ্‌ল,নদী,পাহাড়,চা বাগান সব পেরিয়ে আমাদের ট্রেন দুপুর ১২টায় পৌছলো হাসিমারা স্টেশনে।ট্রেন থেকে নেমে মাথাপিছু ৪০ টাকা ভাড়ায় একটি অটো করে পৌছলাম জয়গাঁও।সেখানে আমাদের ট্যুর অপরেটরের সাথে দেখা করে হিসেব মিটিয়ে কাছেই একটি হোটেল থেকে সুস্বাদু মাছ ভাত দিয়ে আহার সেরে একটি ট্যাক্সি নিয়ে পৌছলাম ফুণ্টশিলং এর হোটেলে।একটু ফ্রেস হয়ে পায়ে পায়ে বেরিয়ে পড়লাম ফুন্টশিলং শহর পরিদর্শনে।১০০ টাকা টিকিট কেটে প্রবেশ করলাম ক্রকোডায়েল পার্কে।এখানে বিভিন্ন জায়গা থেকে আনা ১৫ টা কুমির সংরক্ষন করে রাখা আছে।তাদের দর্শন সেরে ঘুরে নিলাম ফুন্টশিলং মার্কেটে।একমাত্র এখানেই জিনিপত্রের দাম একটু কম,এরপর যত উপরে উঠবে জিনিসের দামও চড়তে থাকবে।ডিনার মার্কেটেই একটি রেস্টুরেন্টে সেরে ফিরে এলাম হোটেলে।পরদিন সকাল ৯টার মধ্যে গেলাম ইমিগ্রেসন অফিসে। দুপুর ১২টায় আমাদের গাড়ি এলো নিতে,লাগেজ তুলে আমরা রওনা দিলাম আমাদের পরের গন্তব্য থিম্ফুর উদ্দেশ্যে।সময় লাগে কমবেশি ৬ ঘন্টা।থিম্ফুর উচ্চতা ৭৬৫৬ ফিট।যতই উপরে উঠতে লাগলাম ততই প্রকৃতির শোভায় মুগ্ধ হতে লাগলাম।পরিস্কার পরিছন্ন রাস্তাঘা্ট,মুক্ত আকাশ,মুক্ত বাতাস মনোরম পাহাড়ি পথের অপরুপ সুন্দর দৃশ্য দেখতে দেখতে সন্ধ্যে ৭ টায় পৌছলাম থিম্ফু তে।



পরদিন সাইটসিনে বেরোলাম সকাল ১০টায়।আমারা যেহেতু পরদিন পুনাখা যাবো এবং ২ রাত্রি সেখানেই থাকবো তাই তার পারমিশন করাতে হবে থিম্ফু থেকে।থিম্ফু থেকে সারাদিনেও ঘুরে আসা যায় পুনাখা সেক্ষেত্রে কোন পারমিশন লাগেনা।প্রথমে তাই ইমিগ্রেসন অফিসে সব কাগজপত্র জমা দিয়ে তারপর সাইটসিনে বেরোলাম।আমরা প্রথমে দেখলাম মেমোরিয়াল চর্টেন।সেখান থেকে এলাম ভূটানের সব থেকে বড় বুদ্ধ মূর্তি দেখতে।এখান থেকে পুরো থিম্ফু শহর খুব সুন্দর দেখায়।এখানকার প্রাকিতিক সৌন্দর্য এতো সুন্দর যে এখান থেকে নামতেই ইচ্ছা করছিলোনা বেশকিছুক্ষন সময় কাটিয়ে এবার পৌছলাম ফ্লোক হ্যারিটেজ মিউজিয়ামে।এটি ১৮ শতাব্দির একটি বিল্ডিং এ ভূটানের আগেকার সময়ে ব্যাবহৃত কিছুজিনিস সংরক্ষন করে রাখা আছে।এর পাশেই রয়েছে ন্যাশেনাল টেক্সটাইল মিউজিয়াম সেটা দেখে আমরা এলাম টাকিন প্রিসার্ভ সেন্টারে।টাকিন ভূটানের জাতীয় পশু,এখানে কিছু টাকিনকে সংরক্ষন করে রাখা আছে।এবার আমরা এলাম ২০০ বছরের পূরনো ছাঙগাখা লাখাং মনেিস্ট্রতে।



এইসব দেখতে দেখতে ৩টে বেজে গেলো।ড্রাইভারজির পছন্দের একটি রেস্টুরেন্টে সেরে নিলাম সুস্বাদু লাঞ্চ।এবার আমরা যাবো তাসি-চু জং পরিদর্শনে।৩০০টাকা টিকিট কেটে এগিয়ে চললাম।এখানে ৯টা-৫টা অফিস চলে তাই সেই সময় ভ্রমনার্থীদের জন্য জং এর গেট বন্ধ থাকে।অফিস শেষেরপর ৫ টায় শুরু হয় পতাকা নামানোর কার্য।এইসময় কয়েকজন সৈন্য সহ উপস্থিত থাকেন রাজ পরিবারের সদস্যরা।এরপর পতাকা নামিয়ে আবার তারা ফিরে যান।ঠিক ৫.৩০ টায় গেট খুলে দেওয়া হয়।প্রত্যেক গ্রুপ পিছু একজন করে গাইড নিয়ে প্রবেশ করতে হবে।বিশাল এলাকা ঘুরে দেখতে ৬.৩০টা বেজে গেলো।৬.৩০টায় গেট বন্ধ হয়ে যায় তাই একেএকে সবাই বেরিয়ে আসলাম।এরপর ৯ টায় সুস্বাদু চিকেন সিজলার সহোযোগে ডিনার সেরে ফিরে এলাম হোটেলে।পরদিন ৮টায় বেরিয়ে পরলাম পুনাখার উদ্দেশ্যে।পুনাখার উচ্চতা ৩৯৩৭ ফিট।সময় লাগবে কমবেশি ৪ঘন্টা।পথেই দেখেনিলাম দোচুলা পাসের বিশেষ দ্রষ্টব্য ১০৮ মেমোরিয়াল স্তুপ।২০০৩ শালে যুদ্ধে ভূটানের ১০৮ জন সৈন্য শহিদ হয়,তাদের স্মৃতির উদ্দশ্যে তৈরি হয়েছিল এই স্তুপ।এই পাসের উচ্চতা ১০০০০ ফিট।পরিস্কার আকাশ থাকলে এখান থেকে ৩৬০* হিমালয়ান প্যেনোরমিক ভিউ দেখা যায়।কিছুক্ষন সময় কাটিয়ে রওনা দিলাম পুনাখার দিকে।দুপুর ১২ টায় পৌছলাম হোটেলে।পুনাখা নদীর পারেই আমাদের হোটেলে।ব্যালকনিতে দাড়ালেই দেখা যাবে প্রবাহমান পুনাখা নদী।যাই হোক স্নান করে রেডি হয়ে লাঞ্চ সেরে ৩ টেয় বেরোলাম পুনাখার সাইটসিনে।প্রথমে এলাম পুনাখা জং এ।২০১১ শালে এখানে বর্তমান ভূটানের রাজার বিবাহ সম্পন্ন হয়েছিলো।তাই এই স্থান একটি আলাদা ঐতিহ্য বহন করে।বতর্মানে এখানে বৌদ্ধ লামারা বসবাস করেন।এখানেও টিকিট কেটে গাইড নিয়ে ঢুকতে হয় কিন্তু ৪টে বেজে গেছে।এটি দেখতে গেলে অন্যস্থানটি আবার দেখা হবেনা তাই চললাম পরের গন্তব্যে পুনাখা সাসপেনসন ব্রীজের উদ্দেশ্যে।গাড়ি থেকে নেমে কিছুটা পথ হেঁটে যেতে হবে।চারিদিকের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অসম্ভব সু্ন্দর।ব্রিজটি ১৬০ মিটার লম্বা।পো ছু নদীর উপর ঝুলন্ত এই ব্রীজের উপর দিয়ে চলার মজাই আলাদা।অন্ধকার নামছে এবার ফিরতে হবে।ফেরার পথে কিছুক্ষন নদীর পারে বসে আড্ডা দিয়ে ফিরে এলাম হোটেলে।পরদিন সকাল ৯ টায় বেরোলাম ফোবজিখা ভ্যালির উদ্দেশ্যে।সময় লাগবে কমবেশি ৩ ঘন্টা।উচচতা ৯৮০০ ফিট।গ্রামের ভিতরের শেষ ৫/৬ কি.মি. রাস্তা একটু খারাপ হলেও পুনাখা থেকে পুরো রাস্তায় সুন্দর মাখনের মতন,আর প্রাকৃতিক শোভার কথা আর কি বল্‌ব,চারিদিকে সবুজের সমারহে মন যেন বারেবারে হারিয়ে যেতে চায়।দুপুর ১২টায় পৌছলাম আমাদের গন্তব্যে।গাড়ি থেকে নেমে আমিতো অবাক প্রকৃতি যে কতো সুন্দর হতে পারে তা হয়তো এখানে না এলে সত্যই বুঝতে পারতাম না।ঈশ্বর প্রকৃতিকে এতো সুন্দর সাজিয়েছে আর আমরা প্রতি মুহূর্তে এর ধবংস লীলায় মেতে উঠেছি।উপর থেকে ভ্যালিটি দেখে মনে হলো সবুজ গালিচা পাতা একটি সবপ্নের দেশ যাতে আছে কয়েকটা খেলনা বাড়ি।এখানে রয়েছে ১৫ শতাব্দির গাঙতে মনাষ্ট্রী।এই জায়গাটি ব্ল্যক নেকড ক্রেনের শীতকালীন আবাস।দুপুর ২টোয় আবার রওনা দিলাম পুনাখার উদ্দশ্যে।


সারাদিন কিছু খাবার পাওয়া যায় নি তাই পুনাখায় পৌছে আগেই চললাম রেস্টুরেণ্টে খেতে।শিঙারা,আলুর পরোটা ডিমের কারি দিয়ে পেটপূজো সেরে হোটেলে এসে ফ্রেস হয়ে ব্যালকনিতে কিছুক্ষন দাড়ালাম কিন্তু সারাদিনের জার্নিতে খুব ক্লান্ত লাগলো,তাই একটু শুলাম যখন ঘুম ভাঙলো তখন ১২টা,আবার ঘুমিয়ে পরলাম।পরদিন সকাল ৭.৩০টায় রওনা হলাম পারোর উদ্দেশ্যে।সময় লাগবে কমবেশি ৪ ঘন্টা।পারোর উচ্চতা ৭২০০ ফিট।ইচ্ছে ছিলো তাড়াতাড়ি পৌছে ঐদিনই টাইগার নেস্ট ট্রেক করবো,আর তার পরদিন যাবো চেলেলা পাস হয়ে হা ভ্যালি।কিন্তু ড্রাইভারজি বললেন ১১ টায় পৌছে টাইগার নেস্ট যাওয়া যাবে না,তাই অগত্যা সেই চিন্তা ছেড়ে দিলাম।পারো ঢুকেই প্রথমে দেখেনিলাম ভিউ পয়েন্ট থেকে পাখির চোখে পারো এয়ারপোর্টকে।ভাগ্য প্রসন্ন ঠিক ঐ সময়ই একটি ফ্লাইট ল্যান্ড করলো,একটি সুন্দর দৃশ্যের সাক্ষী থাকলাম আমরা।পারো মার্কেটে একটি রেসটুরেন্টে লাঞ সেরে এলাম হোটেলে।এখানে আমাদের হোটেলে শহরের কোলাহল থেকে একটু দূরে মাঠ-নদী-পাহাড়ের মাঝে খুবই সুন্দর পরিবেশ চারিপাশের।আর একটা প্লাস পয়েন্ট এই হোটেল থেকে গাড়িতে মাত্র ৩০ মিনিট দূরত্বে এ টাইগার নেস্ট মনাষ্টীর ট্রেকিং শুরুর গেট।যাই হোক হোটেলে লাগেজ নামিয়ে দিয়ে এবার চললাম সাইটসিনে।প্রথমে এলাম টাইগার নেস্ট ভিউ পয়েন্টে।এখানে মহিলা চালিত একটি ছোট মার্কেট মতন আছে।সেখানে বিভিন্ন জিনিসের পসরা সাজিয়ে বসেছেন তারা,এখানে জিনিসের দাম খানিক কম আর দরাদরিও চলে।তাই কয়েকটি জিনিস কিনে এবার এলাম ন্যাশেনাল মিউজিয়াম অফ ভূটানে।২৫ টাকা টিকিট কেটে প্রবেশ করলাম মিউজিয়ামে।ভূটানের বিভিন্ন দ্রষ্টব্য বস্তু সংগ্রহ করে রাখা আছে এখানে।যা ছোট বড় সকলেরই ভালো লাগবে।এরপর এলাম রিংপুং জং এ।ভেতরে আর প্রবেশ করলাম না।বাইরে থেকে দেখে চলে এলাম হোটেলে।সন্ধ্যেবেলা কফি পকড়া চিকেন মোমো সহযোগে চলল আড্ডা।রাত ৯টায় ডিনার সেরে শুয়ে পরলাম।পরদিন সকাল ৮টায় বেরোলাম টাইগার নেস্ট এর উদ্দেশ্যে।৫০০ টাকা টিকিট কেটে ৯টায় যাত্রা শুরু করলাম।কাঁদা প্যাচপ্যাচে রাস্তা দিয়ে শুরু হলো আমাদের যাত্রা।কিছুটা যাওয়ার পর শুরু হলো বৃষ্টি,মাথা গোজার কোন স্থান নেই তাই অগত্যা বৃষ্টি মাথায় নিয়েই চললাম।বৃষ্টি অবশ্য কমে গিয়েছিলো কিছুক্ষনের মধ্যে।রাস্তা খুবই খাঁড়াই তার উপর বৃষ্টির জন্য রাস্তা আরও পিচ্ছিল হতে লাগলো।রাস্তা খুবই শরু ঐ রাস্তা দিয়েই আবার ওঠা নামা করছে যাত্রীবাহি ঘোড়ার পাল।তাদের রাস্তা ছাড়তে কখনও কখনও চলে যেতে হচ্ছে খাদের ধারে।রাস্তা পিচ্ছিল হওয়ায় অনেকেই চোট পেয়ে নেমে আসতে লাগলো।সেই দেখে ভয় লাগলেও মনের জোরে এগিয়ে চললাম।চারপাশের প্রাকৃতিক শোভা অপূর্ব সেই দেখতে দেখতে ১ ঘন্টার রাস্তা ২ ঘন্টায় অতিক্রম করে পৌছলাম প্রথম ধাঁপ ক্যাফেটেরিয়াতে।এখানে একটু বসে কফি বিস্কুট খেয়ে আবার চলা শুরু করলাম।প্রায় ১.৩০ ঘন্টা ট্রেক করে পৌছলাম সেই অনেকদিনের আকাঙ্খিত টাইগার নেস্ট মনাষ্ট্রীতে।কথিত আছে ১৬৯২ খ্রীঃ গুরু রিনপচে সুদূর তিব্বত থেকে এক বাঘিনীর পিঠে সাওয়ার হয়ে এখানে এসে ধ্যান করেছিলেন।পরে স্থানীয় লোকেরা এখানে মনাষ্ট্রী তৈরী করেন।ভেতরে ক্যামেরা মোবাইল নিয়ে প্রবেশ নিষেধ মনেষ্ট্রীর বাইরে লকারে সব জমা করে প্রবেশ করলাম ভেতরে।ভেতরে প্রবেশ করা মাত্রই মনে এক অদ্ভুত শান্তিতে ভরে গেলো।পুরো মনাষ্ট্রী ঘুরে দেখে আবার নামা শুরু করলাম।নামতে বেশি সময় লাগলো না।২ ঘন্টায় নেমে পরলাম।ঘড়িতে ৩ টে বাজে।হোটেলে এসে ফ্রেস হয়ে লাঞ্চ সেরে বেরোলাম পারো মার্কেটে ঘুরতে।জিনিসপত্রের দাম আকাশ ছোয়া তাই কিছুই আর কিনলাম না।কিছুক্ষন নদীর পারে সময় কাটিয়ে ডিনার সেরে ফিরে এলাম হোটেলে। পরদিন সকাল ৮ টায় রওনা হলাম বাড়ির উদ্দেশ্যে।দুপুর ১টায় ফুন্টশিলিং পৌছে কিছু কেনাকাটা করে নিলাম কারন এখানে জিনিসের দাম অনেক সস্তা।এরপর লাঞ্চ সেরে বেরিয়ে হাসিমারা ষ্টেশনে যখন পৌছলাম তখন ৪.৩০টে বেজে গেছে।৪.৪৫ এ ট্রেন এলো ভূটানকে বিদায় জানিয়ে উঠে পরলাম ট্রেনে।মন সবারই খারাপ।আমাদের এই দূষিত আবহাওয়া হইহট্টগোলের শহুরে জীবন থেকে কটাদিন যেন বুক ভরে অক্সিজেন নিয়ে এলাম।আবার ফিরে চলা সেই কংক্রীটের জঙ্গলে।