image description

Eastern Sikkim

পাহাড় ঘুরতে যাওয়ার ইচ্ছে ছিল সবার তাই জানুয়ারির শেষে টিকিট কাটা হলো নিউ জলপাইগুড়ির। তারপর থেকেই উত্তেজনার শুরু। কত রকম জল্পনা কল্পনা, কেনা কাটা। অনেকরকম অনিশ্চয়তার পর অবশেষে আমাদের যাত্রার দিন এলো। ২০শে মে। ১৫ জন বড় ও ৪ জন বাচ্চা নিয়ে মোট ১৯ জন এর দল আমাদের। NJP থেকে সারারাত এর journey ছিল আমাদের। প্রথম সারারাত এর ট্রেন চড়া আমার। ঘুম এলো না আমার মতো আরও অনেকের। পরদিন সকালে ট্রেন থেকে নেমে স্টেশনে জলখাবার সেরে ২টো গাড়ি তে উঠে আমাদের সিকিম এর জন্য পথ চলা শুরু। 
এখানে বলে রাখি আমাদের পরবর্তী ৭ দিন এর রুট।
১. লাভা, রিশপ
২. ছাঙ্গে ঝর্না, লোলেগাঁও
৩. রামধুরা, ডেলো
৪. রংলি হয়ে নাথাং ভ্যালি
৫. ছাঙ্গু হ্রদ, Snow point, কুপুপ হ্রদ/elephanta lake, পুরানো বাবা মন্দির, নতুন বাবা মন্দির, রেশম পথ ধরে ফেরা, থাম্বি ভিউ পয়েন্ট, জুলুক ভিউ পয়েন্ট, পাদামচেন
৬. Qu khola falls/Kali khola falls, আরিতার হ্রদ, রোলেপ
৭. রংপো খোলা,ঝুলন্ত সেতু ও বুদ্ধ falls, নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশন।
প্ৰথম দিন:
আমাদের গন্তব্যস্থল ছিল লাভা। এর উচ্চতা ৭২০০ ফুট। NJP থেকে পৌঁছতে দুপুর ১২ টা বাজলো। এর পর স্নান সেরে দুপুরের খাবার খেয়েই আমরা রেডি রিশপ যাওয়ার জন্য। রিশপ যাওয়ার রাস্তা টা ছিল বেশ উঁচু নিচু পাহাড়ি বাঁক এ ভরা। আর আমাদের সঙ্গী হলো হঠাৎ কুয়াশা। কয়েক হাত দূরের জিনিস ও চোখে দেখা যায় না পরিষ্কার। দক্ষ ড্রাইভার দাদা রা আমাদের নিরাপদে পৌঁছে দিল। উচ্চতা ৭৪০০ ফুট। রিশপ এর সৌন্দর্য দেখে ও বেশ কিছু ছবি তুললাম। মনোরম পাহাড়ের পাশে আরেকটা দৃশ্য ভুলবো না, একজন লোক সুপুরি গাছের মতো পাহাড়ের ধারের সরু একটা গাছে উঠে গাছের ডাল কাটছে, যাতে হোটেলের সামনের ভিউ টা না আটকায়। swag বোধ হয় একেই বলে। হ্যাঁ, তবে জোঁক থেকে সাবধান আমার ভাইপোকে জোঁকে ধরলো গাড়ির মধ্যেই ফেরার সময় সঙ্গে একটু নুন রাখবেন। আমাদের দুই সাথী দাদা বলে উঠলো তারা হেঁটে হোটেলে ফিরবে, না সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্যে নয়, প্রাণ বাঁচানোর তাগিদে। একজন তো হোটেলে ফিরে বলে ফেললো এর থেকে পেটো মারা বা ক্যাচ ধরা সহজ। আমরা এলাম এবার লাভা বৌদ্ধ মঠ এ। বিকাল ৫ টার ভিতর মঠে ঢুকতে হয়। আমাদের তাই তাড়াতাড়ি ভিতরে যেতে হলো। মঠ দেখে ও মঠ এর ভেতরের দোকান থেকে টুকটাক কেনাকাটা করে এবার আমাদের হোটেল এ ফেরার পালা। ফেরার সময় হেঁটেই হোটেলে ফিরলাম। রাতে খাওয়া দাওয়া হোটেলেই করে, সবাই কিছুক্ষন গল্পগুজব আর আড্ডা মেরে ঘুম।


দ্বিতীয় দিন:
সকালে আমাদের গন্তব্য Changey Falls. গাড়ি থেকে নেমে প্রায় ১ কিঃমিঃ ট্রেকিং। দারুন অভিজ্ঞতা। নামতে নামতে হাফিয়ে যাবার পর ই কানে এলো পাহাড়ের ওপর থেকে পাথরের বুকে জলের আছড়ে পড়ার শব্দ। একটা বাঁক ঘুরতেই সামনে বিশাল ছাঙ্গে ঝর্ণা। এখানে সবচেয়ে ভালো লেগেছে falls এর জল অদৃশ্য হচ্ছে একটা গুহা মুখ এর মধ্যে দিয়ে (ছবি সংযোজিত)। ওঠার সময় একটু বেশিই কষ্ট হলেও এত সুন্দর একটা ঝরনা দেখে মন জুড়িয়ে গেল সবার। ফিরে তাড়াতাড়ি দুপুরের খাওয়া লাভা হোটেল এ। এরপর অন্য ২ টো গাড়িতে করে এবার লোলেগাঁও ভ্রমন। 
লোলেগাঁও যাওয়ার আগে আমরা শুনে গিয়েছিলাম অনেক পাখি দেখা যাবে। কিন্তু গিয়ে একটা পাখিও দেখতে পেলাম না যদিও অনেক পাখির কিচিরমিচির শুনলাম। এরপর একে একে ঝুলন্ত সেতুতে ওঠা। একসাথে ৫জন কে উঠতে দেওয়া হয়। ২৫ টাকা প্রতি জন টিকিট। ফেরার সময় আমাদের ড্রাইভার দাদার সাথে গল্প করতে করতে একটাও পাখি দেখতে না পাওয়ার দুঃখ করাতে শুনলাম যারা পাখি দেখতে আসে তারা ভোর ৬ টায় জঙ্গলে ঢোকে আর বিকেলে ফেরে। এবার গাড়িতে আবার লাভা ফেরা। সন্ধ্যেতে মোমো খেয়ে লোকাল মার্কেট থেকে আবার এক প্রস্থ কেনাকাটা করে রাতের খাবার খেয়ে এরপর হোটেল এ ফিরে বাচ্চাদের কিচির মিচির আর আমাদের আড্ডা ও সঙ্গে আরেকটা আলোচনা হাসির আবার অনিশ্চয়তার। একজন সাথী হারানার চিন্তা। একজন একটু বেশিই ভয় পেয়ে পরের দিন ফেরার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। কি হবে কে জানে এবার ঘুমোই।

তৃতীয় দিন:
সকালে ঘুম থেকে উঠে মনটা ভালো লাগলো না যেন আরেকটা শীতের দিনে বাড়িতে ঘুম থেকে ওঠার মতো। বসে আছি এলাম হয়ে বিছানাতে,  আজ খালি রামধুরা গিয়ে থাকার প্ল্যান ছিল।অলস ভাবে তৈরি হতে থাকলাম, না স্নান করা হবে না, জল নেই যদিও থাকলে কতটা করতাম সন্দেহ ছিল। হটাৎ একটু হুল্লোড় আমাদের ঘরে সবাই এসে ঢুকলো, হ্যাঁ কুয়াশা তা কেটে গেছে আর আমাদের ঘরের জানালা দিয়ে এক ফালি কাঞ্চনজঙ্ঘা আর নাথুলা শৃঙ্গ এর দৃশ্য মনটা খুশি করে দিলো। দিনটা বোধ হয় ভালোই যাবে।
ও ভুলেই গিয়েছিলাম, সবাই মিলে আমাদের প্রিয় দাদাটিকে সাহস দিলাম সঙ্গে একটু বাড় ও খাওয়ালাম, কাজ হল। বাঙালি বাড় খেয়ে অনেক কিছুই করতে পারে(অনুরোধ, ক্ষুদিরাম কথাটি ব্যবহার করবেন না)।
ঠান্ডার দিনে গরম লুচি ও তরকারি খেয়ে সবাই উঠলাম গাড়িতে, কয়েক ঘন্টা মধ্যেই পৌঁছে গেলাম রামধুরা। মনোরম পরিবেশ আর পাহাড়ের গায়ে ঝুলে থাকা আমাদের হোম স্টে যদিও আর কয়েক বছর বাদে কলেবরে বেড়ে একটা হোটেলের আকার নেওয়ার জন্যে সে তৈরী হচ্ছে। আমাদের টুর গাইড আজ ঘোরার কোনো প্ল্যান রাখেনি, আমার উৎসুক হয়ে জানলাম আশেপাশে কোথায় কোথায় ঘোরা যেতে পারে?
উত্তর:
১. ঘন্টা চারেক গাড়িতে ডোকলাম।
২. পদব্রজে সাত থেকে আট ঘন্টায় ভুটান।
3. আধ ঘন্টা গাড়িতে ডেলো।
প্রথম ও দ্বিতীয় টি যথাক্রমে সময় ও সাহস এর অভাবে হলো না। 
তাছাড়া তৃতীয় জায়গাটা সাম্প্রতিক অতীতে কিছু রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের জন্যে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। সবাই চললাম। না হয়তো কোনো সেন বাবুর জন্যে জায়গাটি সবার কাছে পরিচিতি পেয়েছে কিন্তু জায়গাটি যোগ্য আলাদা ভাবে মানচিত্রে জায়গা করে নেওয়ার। যদিও জায়গাটিতে পৌঁছনোর পর আমরা নামটি নিয়ে একটু প্রাপ্ত বয়স্ক হাসি ঠাট্টার সুযোগ তৈরী হয়েছিল। সুন্দর পরিবেশ, কে যেন মেঘের মধ্যে দিয়ে উড়ে যাচ্ছে! হ্যাঁ এখানে আপনি মেঘের দেশে উড়ে বেড়াতে পারবেন অনেকগুলি প্যারাগ্লাইডিং সংস্থা আছে এখানে। যদিও একটু পরে মেঘ গুলি আমাদের ধরা দিয়ে গেল ওই ডেলোর পাহাড়ে। অপূর্ব মেঘের ওই লুকোচুরি খেলা। মনে পড়ে গেল সেই মেঘনাদের কথা। না একটু আগে থেকে গেলে আরো ভালো লাগতো। ফেরার সময় জয় বজরংবলি হয়ে হোটেল। পরের বার ডেলোতে একদিন থাকবো।
ক্রমশ......................