image description

বিচিত্রপুর

বেড়াবার নেশাটা আমার বা আমাদের একটু আধটু আছে আসলে কথায় আছে না -'পায়ের তলায় সর্ষে' আর বাঙালীর পায়ের তলায় সর্ষের মাত্রাটা একটু বেশিই। বছরে একবার অন্তত ঘর ছেড়ে না বেড়তে পারলে দমবন্ধ হয়ে আসে। গত দুবছর একটি বিশেষ কারণে কোথাও বেড়াতে যাওয়া হয়নি তবে কারণ টা অবশ্যই পরম আনন্দের। আমাদের পরিবারে  নতুন একজনের আসার দিন গোনা চলছিল আরকি। ২০১৮এর গরমের ছুটিতে একটু ঘর ছেড়ে বেরবো এই ভাবনাটা ছিল মাথায় কিন্তু নতুন সদস্যা আমাদের কন্যা বয়স এখন ১বছর ৫মাস তাই বেশি বড় ট্যুর করা যাবে না এটাও মাথায় ছিল। বাঙালীর সঙ্গে "দীপুদা(দীঘা-পুরী-দার্জিলিং)" তো অঙ্গাঙ্গীক ভাবে জড়িয়ে আছে। তাই প্রাথমিক ভাবে "দী" অর্থাৎ দীঘাকেই বেছে নিয়েছিলাম। দীঘা বেছে নেবার পিছনে আমাদের #অরণ্যা খুব ছোটো সেটা যেমন একটা কারণ আর একটা কারণ হল #বিচিত্রপুর।  এই জায়গার নামটা শেষবার যখন দীঘা গিয়েছিলাম তখনই শুনেছিলাম। পরবর্তীকালে বিভিন্ন গ্রুপে জায়গাটার সম্পর্কে জেনে একটা আকর্ষনও জন্মেছিল। ইউটিউবে বিভিন্ন ভিডিও আছে। ছুটি পরার আগে যখন শুনলাম আমার সহকর্মীরা দীঘা যাবার প্ল্যান করছে তাদের সাথেই ঝুলে পরলাম।

গত ৩০শে মে দীঘা রওনা দিলাম দীঘা লোকালে। সাঁত্রাগাছি থেকে লোকালটা ৬:১০নাগাদ ছাড়ে আমারা ট্রেন মিস করি পরবর্তী লোকালে ধরে মেচেদা পৌঁছে। দীঘা লোকালে চড়ে বসি সকাল ৭:৪৮এ মেচেদা থেকে দীঘার উদ্দেশ্য রওনা হয় ট্রেনটা দীঘায় পৌঁছায় ১০:৫০টা নাগাদ।  যেহেতু আগেই হোটেল বুক করা ছিল তাই দীঘা পৌঁছে ধীরে সুস্থে হোটেলে গিয়ে উঠলাম। তারপর সমুদ্রস্নান, খাওয়া -দাওয়া করতে করতে প্রায় পৌনে চারটে হয়ে গেল। বেরলাম বিচিত্রপুরে যাওয়ার খোঁজ খবর নিতে। ভ্যানো নিলে মাথাপিছু ৭০টাকা(যাওয়া-আসা) বা গাড়ি করলে ৮০০টাকা। দীঘা খুব বেশি হলে ২০কিমির মত রাস্তা। বিচিত্রপুর গেলে জোয়ার থাকাকালীন আর দিনের আলোতে যাওয়া উচিত। বিচিত্রপুর একটা অাইল্যান্ড তাই বেশি কিছু বোটে করে যেতে হয় ওখানে যাবার জন্য। তাই বিকালে না গিয়ে পরের দিন যাব ঠিক করলাম। হোটেলে ফিরে ঘুমের দেশে তলিয়ে গেলাম সারাদিনের ক্লান্তিতে। সন্ধ্যা ৭টায় ঘুম ভাঙতে জানতে পারলাম কলিগ রা তালসারি ঘুরতে গেছে আমরা ঘুমের দেশে ছিলাম তাই দু-একবার ডাকাডাকি করে সাড়া না পেয়ে আর ঘুম ভাঙায় নি।
পরের দিন সকাল ৮টায় একটা গাড়ি ঠিক করে আমার পরিবার ও আমার এক কলিগের পরিবার রওনা দিলাম বিচিত্রপুর। উড়িষ্যার চন্দ্রনেশ্বর মন্দিরের পাশ দিয়ে একটা রাস্তা গেছে তালসারি অন্যটি বিচিত্রপুর। বিচিত্রপুরে পৌঁছে বোটের টিকিট বুক করলাম ৮ সিটের বোট ১২০০টাকা( খুব সম্ভবত ৬ সিটের বোট আছে ভাড়া ৮০০টাকা)।  ওখানে থেকে ২০০মিটার হাঁটার পর বোটে ওটার জায়গা। ওখানে গিয়ে যখন দায়িত্বরপ্রাপ্ত আধিকারিককে টিকিট দেখালাম উনি কম করে ১:৩০ঘন্টা অপেক্ষা করতে হবে। সবে ১১নং টিকিট বোটে চড়ছে তখন আমাদেন ২৩ নং। তারপর উনি একটা বড় বোট ছাড়বে এখুনি যাতে ৪০জন একসাথে যাবে আপনারা তাতে যেতে পারেন সেক্ষেত্রে পার্সোনাল বোট হবে না অনেকের সাথে শেয়ার করতে হবে। আমাদের কারোর কোনো অসুবিধা ছিল না। সুতরাং বোর্ট টা আসতেই আমরা প্রথমেই চড়ে বসি। অন্য একটা গ্রুপও বোর্টে ওঠে বাকি কেউ আর উঠতে চায় না। সুতরাং বোর্ট ছাড়ে। খাঁড়ি বেয়ে বোর্ট এগিয়ে চলে। চারিদিনে ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদে ভর্তি।

বোট যাওয়াটাও শিহরন মেশানো কারণ বোটটা সমুদ্র থেকে আসা স্রোতে মাঝে মাঝে অল্প স্বল্প  দুলে উঠছে তবে ভয়ের কিছু নেই। চারিদিকের প্রকৃতির শোভা এই যাত্রাটা আরো সুন্দর করে তোলে। মিনিট ১৫ বোটে যাবার পর আইল্যান্ডে পৌঁছালাম। যিনি চালক ছিলেন এর একজন সহায়ক তারা দ্রুততার সাথে মই লাগিয়ে দিলেন বোটের সাথে এবং প্রত্যেকে সাহায্যে করলেন বোট থেকে নামতে। বোট থেকে নেমে দুপা হাঁটার পরই প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যে ডুব গেলাম। যেন কোনো শিল্পের আঁকা এক ছবির দেশ। একদিকে সমুদ্রের টেউ পা ছুঁয়ে যাচ্ছে অন্য বালিয়াড়ি আর  ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদের বন। প্রকৃতির রূপ নেশা ধরিয়ে দিল। কিছুক্ষন চুপ করে দাঁড়িয়ে চারপাশটা উপভোগ করতে লাগলাম। তারপর পটাপট কিছু ছবি তুললাম কারণ সময় যে মাত্র ১ঘন্টা। সময় আর কিছুটা বেশি পাওয়া গেলে মন্দ হত না কিন্তু সময় যে বাঁধা। ওখানে একটা অস্থায়ী ছোটো দোকানও আছে যেখানে ঠান্ডা পানীয়, জল, চা এবং ছোটোখাটো টিফিনের করার ব্যবস্থাও আছে কিন্তু দাম একদমই বেশি নয় প্রায় বাজারের সমানই। আপনি চাইলে ঠান্ডা পানীয়ে(সফট ডিঙ্কস) চুমুক দিয়ে দোলায় দুলতে দুলতেও প্রাকৃতিক দৃশ্য উপভোগ করতে পারেন, পর্যটকদের জন্য বেশ কিছু দোলনাও ঝোলানো আছে ওখানে। আমাদের কন্যা তো এখান থেকে কিছুতেই নড়বেন না সমুদ্রের জলে পা ডুবিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলেন। বোটে ওঠার সময় রীতিমত কান্না জুড়ে দিলো আর বার বার আঙুল তুলে ইশারা করতে থাকল ওই দিকে নিয়ে চলো........     


(N.B -  বিচিত্রপুরে এখন পর্যন্ত কোনো থাকার ব্যবস্থা নেই আপনাকে দীঘাতে থেকেই ঘুরতে যেতে হবে।দীঘা থেকে ৪/৫ঘন্টার মধ্যে অনায়াসে ঘুরে আসতে পারবেন।  সকালের দিকে যাওয়াটাই ভালো আমার মতে।)